আইনশৃংখলা -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
ইসলাম, নারী এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ "গোলাম মাওলা রনি"

নব আলো ডেস্ক:নারীর উত্থান, পতন এবং ক্ষমতায়নের ইতিহাসের জটিল রসায়ন পৃথিবীকে করেছে কলঙ্কিত আবার কখনো বা অতি উজ্জ্ব্বল আলোতে উদ্ভাসিত করেছে ধরিত্রীকে। মানব সভ্যতা শুরু হওয়ার বহু শত কিংবা বহু হাজার বছর পূর্বে আমাদের পূর্ব পুরুষরা যখন বাস করতেন পাহাড়ের গুহা, বন-জঙ্গল অথবা কোনো জলাভূমির কিনারে তখন তারা পরিবারবদ্ধ হয়ে থাকার উপায় হিসেবে নারীকে নেতা বানিয়ে জীবনের পথচলা আরম্ভ করলেন।  নারীর নেতৃত্বের সেই ধারা বজায় থাকল কয়েক হাজার বছর অবধি। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের কবলে পড়ে নারীরা তার কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতে এসে নারীরা ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুুখে পড়েন। হুজুরে পাক (সা.)-এর জন্মের পূর্ববর্তী একশ বছরে জাজিরাতুল আরব বা আরবীয় উপদ্বীপ ছাড়াও সমকালীন পৃথিবীর অন্যান্য অংশে নারীদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশাহ, সমাজ-সংসার কিংবা সংগঠন নারীর চিরায়ত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সেই যুগে এগিয়ে এসেছিল বলে কোনো দালিলিক প্রমাণ আজ অবধি আবিষ্কার হয়নি। মানব জাতির ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলামই নারী মুক্তির সনদ বাস্তবায়ন করেছে। পবিত্র আল কোরআনে যেভাবে নারীকে মহিমান্বিত করা হয়েছে তার নজির পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে নেই। নারীর অধিকার, সুরক্ষা, লালন-পালন, বিয়েশাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে পবিত্র কোরআনে যে স্পষ্ট আয়াতসমূহ বর্ণিত হয়েছে তা পৃথিবীর মানুষ রচিত কোনো সংবিধান, অধিকারের দলিল বা রাজার রাজকীয় আদেশনামায় পাওয়া যাবে না। আর এ কারণেই আল কোরআনকে বলা হয় নারী মুক্তির প্রথম ম্যাগনাকার্টা। রসুলে আকরাম (সা.)-এর জীবন, তার শাসনামল এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর অধিকারসমূহ যেভাবে রক্ষিত হয়েছে তা গত চৌদ্দশত বছরে পৃথিবীর অন্য কোনো ভূ-খণ্ডে দেখা যায়নি। ইসলামের অনুসারী মুমিন মোত্তাকীগণ আল্লাহ এবং তাদের রসুল (সা.) নির্দেশে নারীর সম্মান রক্ষা, অধিকার প্রদান এবং লালন-পালনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অন্য কোনো ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে আজ অবধি দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে কোরআন এবং হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং আল্লাহর রসুল (সা.) ব্যক্তিগত জীবনের কিছু উপাখ্যান আলোচনা করলে বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। একটি নারীর তিনটি রূপ বা পরিচয়কে ধর্তব্যের মধ্যে এনে আলোচনাটি শুরু করলে সর্বাঙ্গীন সুন্দর হবে বলে মনে হচ্ছে। নারীকে আমরা পাই কন্যা হিসেবে। তারপর বধূ এবং এক সময়ে মা হিসেবে। নারীর এই ত্রিভূজ রূপের বাংলা প্রতিশব্দ কন্যা-জায়া-জননী নিয়ে রচিত হয়েছে বহু কাব্য, সাহিত্য এবং উপাখ্যান। আজকের আলোচনায় আমরা ওদিকে না গিয়ে বরং কোরআন-হাদিসে কন্যা-জায়া-জননী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে বলে নেই কন্যা সম্পর্কে। জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়া রীতিমতো অবমাননাকর বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ফলে নবজাতিকার জন্মের পর জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই কাজের জন্য রাষ্ট্র কোনো শাস্তি দিত না এবং সমাজও ঘৃণা জানাত না। কন্যা সন্তানদের পিতামাতাকে তৎকালীন সমাজ ঠাট্টা-মসকরা করত। শিশু অবস্থায় কন্যা সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া এবং যৌন নিপীড়ন ছিল প্রচলিত একটি প্রথা। গৃহপালিত পশুপাখি এবং হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের প্রতি মানুষ যতটুকু দরদ ও ভালোবাসা দেখাত ঠিক ততটুকু স্নেহ ভালোবাসা কন্যা সন্তানদের ভাগ্যে জুটত না। সমাজ সংসারের উপরোক্ত ভয়াবহ অবস্থায় ইসলামের আবির্ভাব হয়। যে সমাজে নারীর অধিকার তো দূরর কথা অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়েছিল সেই সমাজে কোরআন ঘোষণা করল যে, নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকারই সমান। কোরআন নারী-পুরুষকে একে অপরের পরিপূরক এবং পরস্পরের পোশাক বলে অভিহিত করল। একটি পোশাক যেমন মানুষকে আবৃত করে রাখে তেমনি মানুষও তার পরিধেয় পোশাকের প্রতি অতীব সতর্ক দৃষ্টি রাখে। কারণ সে জানে যে, পোশাক সম্পর্কে সামান্য গাফেল হলে সে যেমন উলঙ্গ হয়ে পড়বে তেমনি পরিধেয় পোশাকের গুণাগুণ রং এবং পোশাকটি পরিধানের ধরন ও প্রকৃতির ওপর তার আভিজাত্য, রুচি এবং মননশীলতা নির্ভর করবে। নারীর মর্যাদা এবং মহিমা বোঝানোর জন্য পবিত্র কোরআনের সূরাসমূহের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করা যেতে পারে। নারী জাতিকে উদ্দেশ করে নাজিলকৃত সূরাটির নাম নিসা যা কিনা আল কোরআনের বৃহত্তম সূরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে মানব জাতিকে উদ্দেশ করে নাজিলকৃত সূরাটির নাম নাস যা কিনা আল কোরআনের ক্ষুদ্রতম সূরাগুলোর অন্যতম। ব্যক্তিগতভাবে স্বতন্ত্র একজন নারীর নামেও সূরা নাজিল হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.)-এর মায়ের নামে নাজিলকৃত সূরাটির নাম মারিয়াম। এবার কন্যা সন্তানের গুরুত্ব এবং তাত্পর্য সম্পর্কে হাদিস কী বলে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। রসুল (সা.) বলেছেন— কোনো ব্যক্তির যদি তিনটি কন্যা সন্তান থাকে এবং লোকটি যদি কন্যাদেরকে আদর যত্ন করে লালন-পালনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা দেয় এবং সৎ পাত্রে বিয়েশাদির আয়োজন করে তবে লোকটি জান্নাতে আমি নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বসবাসের সুযোগ লাভ করবে। সর্বকালের সমাজ-সংসার এবং রাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে নবী (সা.) বলেন, তোমরা কেউ কোনো দিন কন্যা সন্তানের পিতাকে গালি দেবে না কারণ আমি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহও (সা.) যে কন্যাদের পিতা। তিনি কন্যা সন্তানের পিতাদের উদ্দেশ করে বলেন— দূর দেশে সফরে গেলে ফেরার সময় অবশ্যই কন্যাদের জন্য উপহার সামগ্রী নিয়ে আসবে। ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্বে সবার শেষে কন্যাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে এবং ঘরে ফিরে সবার আগে কন্যা সন্তানদের খোঁজ করবে। রসুল (সা.) তার কন্যা সন্তানদেরকে অতীব আদর যত্ন এবং স্নেহ ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছিলেন। খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (রা.)-এর প্রতি তার অবারিত স্নেহ মানব জাতির ইতিহাসে পিতা-কন্যার সর্বজনীন সম্পর্কের কিংবদন্তি মাইলফলক হয়ে আছে। কন্যা সন্তানের পর এবার আমরা নারী হিসেবে স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব। বিয়েশাদির ব্যাপারে ইসলামী আইন হলো— নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে কোনো বিয়ে হবে না। সম্মতির ক্ষেত্রে নারী সর্বপ্রথম ইলা অর্থাৎ তার হবু স্বামীকে পছন্দ করার ক্ষেত্রে নিজের সম্মতি জ্ঞাপন করবেন। পরে পুরুষ কবুলিয়ত অর্থাৎ নারীর সম্মতি গ্রহণ করলাম বা আমি রাজি আছি বলে বিয়েতে নিজের মতামত প্রদান করবেন। জাহেলি যুগে বিয়েতে নারীপক্ষকে যৌতুক দিতে হতো। ইসলাম যৌতুক প্রথাকে হারাম করে দিয়েছে। যৌতুক গ্রহণকে এমন গুরুতর গুনাহ বলে আখ্যা দিয়েছে যেমনি সাধিত হয়ে থাকে শুয়োরের মাংস ভক্ষণের ফলে অথবা কুকুরের মতো হারাম প্রাণীদের মলমূত্র ভক্ষণের মাধ্যমে। বিয়েতে যৌতুককে নিষিদ্ধ করা হলেও কন্যাপক্ষ কর্তৃক উপহার প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে— তবে তা অবশ্যই কন্যার পিতার শক্তি-সামর্থ্য, রুচি এবং পছন্দের ওপর নির্ভর করবে। আল্লাহর রসুল (সা.) তার প্রিয়তমা কন্যা মা ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে তোহফা হিসেবে প্রদান করেছিলেন খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি একটি তোষক, একটি চামড়ার তৈরি কুয়া থেকে পানি তোলার মশক এবং গম পিষে আটা বানানোর জন্য একটি জাঁতা। বিয়ের পর একটি নারীর বহুমুখী অধিকার এবং মর্যাদা ইসলাম ধার্য করে দিয়েছে। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং স্বাধীন করার মানসে বিয়ের শর্ত হিসেবে মোহরানার বিধান রাখা হয়েছে। মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা কন্যাপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। বাসর রাতের পূর্বেই মোহরানার অর্থ আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মোহরানার অর্থগ্রহণ এবং সেই অর্থ দ্বারা স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার ইসলামী শরিয়ত নারীকে দিয়েছে। ইসলাম নারীকে তিনভাবে এবং একই সঙ্গে তিনটি স্থান বা সূত্র থেকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী মনোনীত করেছে। পিতা, স্বামী এবং সন্তানদের সম্পত্তিতে নারীর অংশীদার হওয়ার বিধান রয়েছে। মোহরানা, খোরপোশ, উপার্জিত ধনসম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধন সম্পত্তি নারী স্বাধীনভাবে ভোগ, দখল, দান কিংবা বিক্রয় করতে পারবে। আর এসব কিছুই হয়েছিল আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে ইসলামী শরিয়ত এবং হুকুমাতের মাধ্যমে। নারীর অধিকারকে যেন কেউ ক্ষুণ্ন করতে না পারে সে জন্য ইসলামী হুকুমত দুনিয়াতে যেমন ব্যবস্থা রেখেছে তেমনি আখেরাতেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। মোহরানার অর্থ দাবি করে মুসলিম নারী স্বামীর বিরুদ্ধে যেমন মামলা দায়ের করতে পারে তেমনি টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সে তার স্বামীর সঙ্গে ঘর-সংসার করতে অস্বীকার জানাতে পারে। মোহরানার অর্থ পরিশোধ না করে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘর-সংসার শুরু করে তবে সেই স্বামীকে রোজ কিয়ামতে জেনাকারের কাতারে শামিল করা হবে। একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে সফলতার স্বর্ণ সিংহাসনে আসীন থাকলেও তার খোরপোশ এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বামীকেই বহন করতে হবে। একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য তার স্ত্রীকে দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্য উত্তম অসিলা এবং সাক্ষী বানানো হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মহব্বত এবং সম্মান সম্পর্কে বলা হয়েছে— স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যদি একে অপরের দিকে মহব্বতের দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তবে উভয়ের আমলনামা থেকে সগিরা গুণাসমূহ মুছে ফেলা হবে। আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন— তোমরা যদি একজন বিবাহিত মানুষের চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাও তবে তার স্ত্রীর সাক্ষ্যগ্রহণ কর। অন্য একটি রেওয়াতে বলা হয়েছে— স্ত্রীদের সুপারিশ, সাক্ষ্য কিংবা প্রত্যয়ন ব্যতিরেকে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। জান্নাতের দরজায় লেখা রয়েছে, দাউসের জন্য জান্নাতে প্রবেশ নিষেধ। দাউস বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যে কিনা শরিয়তের বিধান মোতাবেক স্ত্রীর হক আদায় করেনি এবং ব্যক্তিত্বের অক্ষমতা বা দুর্বলতার কারণে স্ত্রীকে স্বেচ্ছাচারী বা গাফেল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ পুরুষই হয়তো তাদের স্ত্রীদের দিকে মহব্বতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান না। তারা সংসার জীবনের নিত্য ব্যবহার্য অন্যান্য বস্তু এবং বস্তুগত সামগ্রীর মতো টেনেটুনে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন। তারা সুখময় দাম্পত্য গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা-তদ্বির করেন না কিংবা হয়তো জানেনও না। তারা দাম্পত্য সুখের জন্য আল্লাহর সাহায্য চান না বললেই চলে। অন্যদিকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তাগিদও খুব কম লোকেই অনুভব করেন। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর এবং সুখময় করার মহত্তম উপায়সমূহ। স্বয়ং আল্লাহর রসুল (সা.) তার স্ত্রীদের প্রতি যে ইনসাফ এবং এহসান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার কিয়দংশও যদি আমরা নিজেদের বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করি তবে ধরাধামে আমাদের একেকটি পরিবার একেকটি জান্নাতের টুকরায় পরিণত হবে। হুজুর (সা.) তার স্ত্রীদের প্রতি কতটা মহব্বত প্রদর্শন করতেন তা হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণিত নিম্নের হাদিস থেকেই বোঝা যাবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘জোত্স্না প্লাবিত এক রাতে আল্লাহ রসুল (সা.) আমাকে বললেন, চল আয়েশা! আমরা বাইরে থেকে একটু বেড়িয়ে আসি। কিছু দূর এগোনোর পর রসুল (সা.) বললেন— চল আয়েশা আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি— ওই যে দূরে পাথর খণ্ড দেখা যাচ্ছে আমরা দৌড় দিয়ে সবার আগে যে পাথরটিকে ছুঁতে সক্ষম হব সেই হবে আজকের রাতের বিজয়ী। আমরা উভয়ে দৌড় দিলাম এবং আমি বিজয়ী হলাম। এ ঘটনার অনেক দিন পর আল্লাহর রসুলের কথামতো আমরা আরও একটি চাঁদনী রাতে পুনরায় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম। সেবার আমি বেশ মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে দৌড়ে আমি পরাজিত হলাম। আল্লাহর রসুল (সা.) বিজয়ী হয়ে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলেন এবং বললেন— আয়েশা! মনে আছে! এই স্থানে বহুদিন পূর্বে তুমি আমায় পরাজিত করেছিলে! আজ বিজয়ী হয়ে সেদিনের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম! নারীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ মাতৃরূপ নিয়ে আলোচনা শেষে আজকের প্রসঙ্গের ইতি টানব। মা হিসেবে ইসলাম নারীকে সবার ওপর মর্যাদা দান করেছেন। নারীর মাতৃরূপের মর্যাদার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো পদ-পদবি, সিংহাসন, রাজা-বাদশাহর ফরমান এমনকি পিতার আসনও তুলনীয় নয়। একজন সন্তানের নিকট তার মা হলেন সর্বোচ্চ সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। জনৈক সাহাবা আল্লাহর রসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন— ইয়া রসুলুল্লাহ। এই দুনিয়ায় আমি সবচেয়ে কাকে বেশি মর্যাদা দেব! রসুল (সা.) বললেন— তোমার মাকে। প্রশ্ন করা হলো— এরপর কাকে? উত্তর এলো— তোমার মাকে। আবার প্রশ্ন করা হলো— এরপর কাকে? বলা হলো— মাকে। প্রশ্নটি চতুর্থবার করা হলো এবং চতুর্থ স্তরে মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে বলা হলো— তোমার পিতাকে। জনৈক সাহাবি আল্লাহর রসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন— ইয়া রসুলুল্লাহ! এই দেখুন! আমার বুড়ি মা। আমি তাকে সুদূর ইয়ামেন থেকে কাঁধে করে মক্কা নিয়ে এসেছি হজ করার জন্য। তাকে কাঁধে নিয়ে তওয়াফ করেছি— সায়ী করেছি— মুজদালেফা-আরাফার ময়দানে হজের আনুষ্ঠানিকতা করে মদিনা নিয়ে এসেছি। হে রসুল! আমি কি মায়ের হক আদায় করতে পেরেছি?  হুজুর (সা.) জবাব দিলেন— না! পারনি। আল্লাহর রসুল (সা.)-এর জমানায় কতিপয় প্রসিদ্ধ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে তাদের মায়ের সম্পর্ক এবং শ্রদ্ধাবোধের কাহিনী আজও কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হজরত মুসা (আ.)-এর জমানার জনৈক মাংস বিক্রেতার কাহিনীসহ যুগ যুগান্তরের অসংখ্য অলি আল্লাহ, গাউস-কুতুব, আবেদ-আবদালের মাতৃভক্তির কাহিনী পৃথিবীর তামাম নারী জাতিকে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে আসীন করেছে। রসুল (সা.) বলেছেন— মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশ্ত। এই একটি বাক্য দ্বারাই ইসলামে নারীর মর্যাদার স্বরূপ সহজেই অনুমান করা সম্ভব। এই বাক্যটির দ্বারাই ইসলামে নারী-পুরুষের অবস্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একজন পুরুষের পায়ের তলার জিনিসের কথা যদি আসে তবে যে কোনো সাধারণ মানুষ বলবেন— লোকটির পায়ের নিচে রয়েছে জুতা। আর লোকটির পায়ে যদি জুতা না থাকে— তবে তার পায়ের নিচে থাকবে ধুলা, ধুসরিত পঙ্কিল অথবা মরুময় জমিন। অন্যদিকে মাতৃরূপী নারীর পায়ের তলায় থাকে তার সন্তানদের জন্য জান্নাত। ঊর্ধালোকের জান্নাত কেবলমাত্র মায়ের মর্যাদায় ধরাধামে এসে ধরা দেয় তার পায়ের নিচে। পৃথিবীর সব নারী যদি জানতেন যে ইসলাম তাদেরকে এতসব মর্যাদা এবং অধিকার দান করেছে তবে সবাই মিছিল করে রাষ্ট্রশক্তি সমূহের নিকট দাবি তুলতেন— আর কিছু চাই না!  আল্লাহ আমাদেরকে যেসব অধিকার দিয়েছেন, শুধু সেগুলোই আমাদেরকে ফেরত দিন। লেখক : কলামিস্ট।

ইসলাম, নারী এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ "গোলাম মাওলা রনি"
                                  

নব আলো ডেস্ক:নারীর উত্থান, পতন এবং ক্ষমতায়নের ইতিহাসের জটিল রসায়ন পৃথিবীকে করেছে কলঙ্কিত আবার কখনো বা অতি উজ্জ্ব্বল আলোতে উদ্ভাসিত করেছে ধরিত্রীকে। মানব সভ্যতা শুরু হওয়ার বহু শত কিংবা বহু হাজার বছর পূর্বে আমাদের পূর্ব পুরুষরা যখন বাস করতেন পাহাড়ের গুহা, বন-জঙ্গল অথবা কোনো জলাভূমির কিনারে তখন তারা পরিবারবদ্ধ হয়ে থাকার উপায় হিসেবে নারীকে নেতা বানিয়ে জীবনের পথচলা আরম্ভ করলেন।  নারীর নেতৃত্বের সেই ধারা বজায় থাকল কয়েক হাজার বছর অবধি। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিবর্তনের কবলে পড়ে নারীরা তার কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতে এসে নারীরা ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুুখে পড়েন। হুজুরে পাক (সা.)-এর জন্মের পূর্ববর্তী একশ বছরে জাজিরাতুল আরব বা আরবীয় উপদ্বীপ ছাড়াও সমকালীন পৃথিবীর অন্যান্য অংশে নারীদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশাহ, সমাজ-সংসার কিংবা সংগঠন নারীর চিরায়ত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সেই যুগে এগিয়ে এসেছিল বলে কোনো দালিলিক প্রমাণ আজ অবধি আবিষ্কার হয়নি। মানব জাতির ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলামই নারী মুক্তির সনদ বাস্তবায়ন করেছে। পবিত্র আল কোরআনে যেভাবে নারীকে মহিমান্বিত করা হয়েছে তার নজির পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে নেই। নারীর অধিকার, সুরক্ষা, লালন-পালন, বিয়েশাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে পবিত্র কোরআনে যে স্পষ্ট আয়াতসমূহ বর্ণিত হয়েছে তা পৃথিবীর মানুষ রচিত কোনো সংবিধান, অধিকারের দলিল বা রাজার রাজকীয় আদেশনামায় পাওয়া যাবে না। আর এ কারণেই আল কোরআনকে বলা হয় নারী মুক্তির প্রথম ম্যাগনাকার্টা। রসুলে আকরাম (সা.)-এর জীবন, তার শাসনামল এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর অধিকারসমূহ যেভাবে রক্ষিত হয়েছে তা গত চৌদ্দশত বছরে পৃথিবীর অন্য কোনো ভূ-খণ্ডে দেখা যায়নি। ইসলামের অনুসারী মুমিন মোত্তাকীগণ আল্লাহ এবং তাদের রসুল (সা.) নির্দেশে নারীর সম্মান রক্ষা, অধিকার প্রদান এবং লালন-পালনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অন্য কোনো ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে আজ অবধি দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে কোরআন এবং হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং আল্লাহর রসুল (সা.) ব্যক্তিগত জীবনের কিছু উপাখ্যান আলোচনা করলে বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। একটি নারীর তিনটি রূপ বা পরিচয়কে ধর্তব্যের মধ্যে এনে আলোচনাটি শুরু করলে সর্বাঙ্গীন সুন্দর হবে বলে মনে হচ্ছে। নারীকে আমরা পাই কন্যা হিসেবে। তারপর বধূ এবং এক সময়ে মা হিসেবে। নারীর এই ত্রিভূজ রূপের বাংলা প্রতিশব্দ কন্যা-জায়া-জননী নিয়ে রচিত হয়েছে বহু কাব্য, সাহিত্য এবং উপাখ্যান। আজকের আলোচনায় আমরা ওদিকে না গিয়ে বরং কোরআন-হাদিসে কন্যা-জায়া-জননী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে বলে নেই কন্যা সম্পর্কে। জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়া রীতিমতো অবমাননাকর বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ফলে নবজাতিকার জন্মের পর জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই কাজের জন্য রাষ্ট্র কোনো শাস্তি দিত না এবং সমাজও ঘৃণা জানাত না। কন্যা সন্তানদের পিতামাতাকে তৎকালীন সমাজ ঠাট্টা-মসকরা করত। শিশু অবস্থায় কন্যা সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া এবং যৌন নিপীড়ন ছিল প্রচলিত একটি প্রথা। গৃহপালিত পশুপাখি এবং হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের প্রতি মানুষ যতটুকু দরদ ও ভালোবাসা দেখাত ঠিক ততটুকু স্নেহ ভালোবাসা কন্যা সন্তানদের ভাগ্যে জুটত না। সমাজ সংসারের উপরোক্ত ভয়াবহ অবস্থায় ইসলামের আবির্ভাব হয়। যে সমাজে নারীর অধিকার তো দূরর কথা অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়েছিল সেই সমাজে কোরআন ঘোষণা করল যে, নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকারই সমান। কোরআন নারী-পুরুষকে একে অপরের পরিপূরক এবং পরস্পরের পোশাক বলে অভিহিত করল। একটি পোশাক যেমন মানুষকে আবৃত করে রাখে তেমনি মানুষও তার পরিধেয় পোশাকের প্রতি অতীব সতর্ক দৃষ্টি রাখে। কারণ সে জানে যে, পোশাক সম্পর্কে সামান্য গাফেল হলে সে যেমন উলঙ্গ হয়ে পড়বে তেমনি পরিধেয় পোশাকের গুণাগুণ রং এবং পোশাকটি পরিধানের ধরন ও প্রকৃতির ওপর তার আভিজাত্য, রুচি এবং মননশীলতা নির্ভর করবে। নারীর মর্যাদা এবং মহিমা বোঝানোর জন্য পবিত্র কোরআনের সূরাসমূহের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করা যেতে পারে। নারী জাতিকে উদ্দেশ করে নাজিলকৃত সূরাটির নাম নিসা যা কিনা আল কোরআনের বৃহত্তম সূরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে মানব জাতিকে উদ্দেশ করে নাজিলকৃত সূরাটির নাম নাস যা কিনা আল কোরআনের ক্ষুদ্রতম সূরাগুলোর অন্যতম। ব্যক্তিগতভাবে স্বতন্ত্র একজন নারীর নামেও সূরা নাজিল হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.)-এর মায়ের নামে নাজিলকৃত সূরাটির নাম মারিয়াম। এবার কন্যা সন্তানের গুরুত্ব এবং তাত্পর্য সম্পর্কে হাদিস কী বলে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। রসুল (সা.) বলেছেন— কোনো ব্যক্তির যদি তিনটি কন্যা সন্তান থাকে এবং লোকটি যদি কন্যাদেরকে আদর যত্ন করে লালন-পালনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা দেয় এবং সৎ পাত্রে বিয়েশাদির আয়োজন করে তবে লোকটি জান্নাতে আমি নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বসবাসের সুযোগ লাভ করবে। সর্বকালের সমাজ-সংসার এবং রাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে নবী (সা.) বলেন, তোমরা কেউ কোনো দিন কন্যা সন্তানের পিতাকে গালি দেবে না কারণ আমি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহও (সা.) যে কন্যাদের পিতা। তিনি কন্যা সন্তানের পিতাদের উদ্দেশ করে বলেন— দূর দেশে সফরে গেলে ফেরার সময় অবশ্যই কন্যাদের জন্য উপহার সামগ্রী নিয়ে আসবে। ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্বে সবার শেষে কন্যাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে এবং ঘরে ফিরে সবার আগে কন্যা সন্তানদের খোঁজ করবে। রসুল (সা.) তার কন্যা সন্তানদেরকে অতীব আদর যত্ন এবং স্নেহ ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছিলেন। খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (রা.)-এর প্রতি তার অবারিত স্নেহ মানব জাতির ইতিহাসে পিতা-কন্যার সর্বজনীন সম্পর্কের কিংবদন্তি মাইলফলক হয়ে আছে। কন্যা সন্তানের পর এবার আমরা নারী হিসেবে স্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব। বিয়েশাদির ব্যাপারে ইসলামী আইন হলো— নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে কোনো বিয়ে হবে না। সম্মতির ক্ষেত্রে নারী সর্বপ্রথম ইলা অর্থাৎ তার হবু স্বামীকে পছন্দ করার ক্ষেত্রে নিজের সম্মতি জ্ঞাপন করবেন। পরে পুরুষ কবুলিয়ত অর্থাৎ নারীর সম্মতি গ্রহণ করলাম বা আমি রাজি আছি বলে বিয়েতে নিজের মতামত প্রদান করবেন। জাহেলি যুগে বিয়েতে নারীপক্ষকে যৌতুক দিতে হতো। ইসলাম যৌতুক প্রথাকে হারাম করে দিয়েছে। যৌতুক গ্রহণকে এমন গুরুতর গুনাহ বলে আখ্যা দিয়েছে যেমনি সাধিত হয়ে থাকে শুয়োরের মাংস ভক্ষণের ফলে অথবা কুকুরের মতো হারাম প্রাণীদের মলমূত্র ভক্ষণের মাধ্যমে। বিয়েতে যৌতুককে নিষিদ্ধ করা হলেও কন্যাপক্ষ কর্তৃক উপহার প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে— তবে তা অবশ্যই কন্যার পিতার শক্তি-সামর্থ্য, রুচি এবং পছন্দের ওপর নির্ভর করবে। আল্লাহর রসুল (সা.) তার প্রিয়তমা কন্যা মা ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে তোহফা হিসেবে প্রদান করেছিলেন খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি একটি তোষক, একটি চামড়ার তৈরি কুয়া থেকে পানি তোলার মশক এবং গম পিষে আটা বানানোর জন্য একটি জাঁতা। বিয়ের পর একটি নারীর বহুমুখী অধিকার এবং মর্যাদা ইসলাম ধার্য করে দিয়েছে। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং স্বাধীন করার মানসে বিয়ের শর্ত হিসেবে মোহরানার বিধান রাখা হয়েছে। মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা কন্যাপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। বাসর রাতের পূর্বেই মোহরানার অর্থ আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মোহরানার অর্থগ্রহণ এবং সেই অর্থ দ্বারা স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার ইসলামী শরিয়ত নারীকে দিয়েছে। ইসলাম নারীকে তিনভাবে এবং একই সঙ্গে তিনটি স্থান বা সূত্র থেকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী মনোনীত করেছে। পিতা, স্বামী এবং সন্তানদের সম্পত্তিতে নারীর অংশীদার হওয়ার বিধান রয়েছে। মোহরানা, খোরপোশ, উপার্জিত ধনসম্পত্তি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ধন সম্পত্তি নারী স্বাধীনভাবে ভোগ, দখল, দান কিংবা বিক্রয় করতে পারবে। আর এসব কিছুই হয়েছিল আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে ইসলামী শরিয়ত এবং হুকুমাতের মাধ্যমে। নারীর অধিকারকে যেন কেউ ক্ষুণ্ন করতে না পারে সে জন্য ইসলামী হুকুমত দুনিয়াতে যেমন ব্যবস্থা রেখেছে তেমনি আখেরাতেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। মোহরানার অর্থ দাবি করে মুসলিম নারী স্বামীর বিরুদ্ধে যেমন মামলা দায়ের করতে পারে তেমনি টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সে তার স্বামীর সঙ্গে ঘর-সংসার করতে অস্বীকার জানাতে পারে। মোহরানার অর্থ পরিশোধ না করে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘর-সংসার শুরু করে তবে সেই স্বামীকে রোজ কিয়ামতে জেনাকারের কাতারে শামিল করা হবে। একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে সফলতার স্বর্ণ সিংহাসনে আসীন থাকলেও তার খোরপোশ এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বামীকেই বহন করতে হবে। একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য তার স্ত্রীকে দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্য উত্তম অসিলা এবং সাক্ষী বানানো হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মহব্বত এবং সম্মান সম্পর্কে বলা হয়েছে— স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যদি একে অপরের দিকে মহব্বতের দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তবে উভয়ের আমলনামা থেকে সগিরা গুণাসমূহ মুছে ফেলা হবে। আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন— তোমরা যদি একজন বিবাহিত মানুষের চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাও তবে তার স্ত্রীর সাক্ষ্যগ্রহণ কর। অন্য একটি রেওয়াতে বলা হয়েছে— স্ত্রীদের সুপারিশ, সাক্ষ্য কিংবা প্রত্যয়ন ব্যতিরেকে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। জান্নাতের দরজায় লেখা রয়েছে, দাউসের জন্য জান্নাতে প্রবেশ নিষেধ। দাউস বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যে কিনা শরিয়তের বিধান মোতাবেক স্ত্রীর হক আদায় করেনি এবং ব্যক্তিত্বের অক্ষমতা বা দুর্বলতার কারণে স্ত্রীকে স্বেচ্ছাচারী বা গাফেল হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ পুরুষই হয়তো তাদের স্ত্রীদের দিকে মহব্বতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান না। তারা সংসার জীবনের নিত্য ব্যবহার্য অন্যান্য বস্তু এবং বস্তুগত সামগ্রীর মতো টেনেটুনে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন। তারা সুখময় দাম্পত্য গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা-তদ্বির করেন না কিংবা হয়তো জানেনও না। তারা দাম্পত্য সুখের জন্য আল্লাহর সাহায্য চান না বললেই চলে। অন্যদিকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তাগিদও খুব কম লোকেই অনুভব করেন। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর এবং সুখময় করার মহত্তম উপায়সমূহ। স্বয়ং আল্লাহর রসুল (সা.) তার স্ত্রীদের প্রতি যে ইনসাফ এবং এহসান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার কিয়দংশও যদি আমরা নিজেদের বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করি তবে ধরাধামে আমাদের একেকটি পরিবার একেকটি জান্নাতের টুকরায় পরিণত হবে। হুজুর (সা.) তার স্ত্রীদের প্রতি কতটা মহব্বত প্রদর্শন করতেন তা হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণিত নিম্নের হাদিস থেকেই বোঝা যাবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘জোত্স্না প্লাবিত এক রাতে আল্লাহ রসুল (সা.) আমাকে বললেন, চল আয়েশা! আমরা বাইরে থেকে একটু বেড়িয়ে আসি। কিছু দূর এগোনোর পর রসুল (সা.) বললেন— চল আয়েশা আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি— ওই যে দূরে পাথর খণ্ড দেখা যাচ্ছে আমরা দৌড় দিয়ে সবার আগে যে পাথরটিকে ছুঁতে সক্ষম হব সেই হবে আজকের রাতের বিজয়ী। আমরা উভয়ে দৌড় দিলাম এবং আমি বিজয়ী হলাম। এ ঘটনার অনেক দিন পর আল্লাহর রসুলের কথামতো আমরা আরও একটি চাঁদনী রাতে পুনরায় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম। সেবার আমি বেশ মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে দৌড়ে আমি পরাজিত হলাম। আল্লাহর রসুল (সা.) বিজয়ী হয়ে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলেন এবং বললেন— আয়েশা! মনে আছে! এই স্থানে বহুদিন পূর্বে তুমি আমায় পরাজিত করেছিলে! আজ বিজয়ী হয়ে সেদিনের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম! নারীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ মাতৃরূপ নিয়ে আলোচনা শেষে আজকের প্রসঙ্গের ইতি টানব। মা হিসেবে ইসলাম নারীকে সবার ওপর মর্যাদা দান করেছেন। নারীর মাতৃরূপের মর্যাদার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো পদ-পদবি, সিংহাসন, রাজা-বাদশাহর ফরমান এমনকি পিতার আসনও তুলনীয় নয়। একজন সন্তানের নিকট তার মা হলেন সর্বোচ্চ সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। জনৈক সাহাবা আল্লাহর রসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন— ইয়া রসুলুল্লাহ। এই দুনিয়ায় আমি সবচেয়ে কাকে বেশি মর্যাদা দেব! রসুল (সা.) বললেন— তোমার মাকে। প্রশ্ন করা হলো— এরপর কাকে? উত্তর এলো— তোমার মাকে। আবার প্রশ্ন করা হলো— এরপর কাকে? বলা হলো— মাকে। প্রশ্নটি চতুর্থবার করা হলো এবং চতুর্থ স্তরে মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে বলা হলো— তোমার পিতাকে। জনৈক সাহাবি আল্লাহর রসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন— ইয়া রসুলুল্লাহ! এই দেখুন! আমার বুড়ি মা। আমি তাকে সুদূর ইয়ামেন থেকে কাঁধে করে মক্কা নিয়ে এসেছি হজ করার জন্য। তাকে কাঁধে নিয়ে তওয়াফ করেছি— সায়ী করেছি— মুজদালেফা-আরাফার ময়দানে হজের আনুষ্ঠানিকতা করে মদিনা নিয়ে এসেছি। হে রসুল! আমি কি মায়ের হক আদায় করতে পেরেছি?  হুজুর (সা.) জবাব দিলেন— না! পারনি। আল্লাহর রসুল (সা.)-এর জমানায় কতিপয় প্রসিদ্ধ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে তাদের মায়ের সম্পর্ক এবং শ্রদ্ধাবোধের কাহিনী আজও কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হজরত মুসা (আ.)-এর জমানার জনৈক মাংস বিক্রেতার কাহিনীসহ যুগ যুগান্তরের অসংখ্য অলি আল্লাহ, গাউস-কুতুব, আবেদ-আবদালের মাতৃভক্তির কাহিনী পৃথিবীর তামাম নারী জাতিকে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে আসীন করেছে। রসুল (সা.) বলেছেন— মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশ্ত। এই একটি বাক্য দ্বারাই ইসলামে নারীর মর্যাদার স্বরূপ সহজেই অনুমান করা সম্ভব। এই বাক্যটির দ্বারাই ইসলামে নারী-পুরুষের অবস্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একজন পুরুষের পায়ের তলার জিনিসের কথা যদি আসে তবে যে কোনো সাধারণ মানুষ বলবেন— লোকটির পায়ের নিচে রয়েছে জুতা। আর লোকটির পায়ে যদি জুতা না থাকে— তবে তার পায়ের নিচে থাকবে ধুলা, ধুসরিত পঙ্কিল অথবা মরুময় জমিন। অন্যদিকে মাতৃরূপী নারীর পায়ের তলায় থাকে তার সন্তানদের জন্য জান্নাত। ঊর্ধালোকের জান্নাত কেবলমাত্র মায়ের মর্যাদায় ধরাধামে এসে ধরা দেয় তার পায়ের নিচে। পৃথিবীর সব নারী যদি জানতেন যে ইসলাম তাদেরকে এতসব মর্যাদা এবং অধিকার দান করেছে তবে সবাই মিছিল করে রাষ্ট্রশক্তি সমূহের নিকট দাবি তুলতেন— আর কিছু চাই না!  আল্লাহ আমাদেরকে যেসব অধিকার দিয়েছেন, শুধু সেগুলোই আমাদেরকে ফেরত দিন। লেখক : কলামিস্ট।

নুহ নবীর নৌকার খোঁজে
                                  

 প্রত্নতত্ত্ববিদরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন স্থানগুলো খুঁজে বের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। গ্রিক মহাকবি হোমারের ওডিসিতে বর্ণিত ট্রয় নগরী পুরাকীর্তি অভিযানের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত শেবার রানী বিলকিসের প্রাসাদ প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে ইথিওপিয়ার আকসুম নগরীতে খুঁজে পাওয়া গেছে। দাম্ভিক রাজা সাদ্দাদের বেহেশত বলে কথিত ইরম নগরীর ধ্বংসাবশেষও আবিষ্কার করা হয়েছে। নুহ নবীর নৌকার ঘটনা কয়েক হাজার বছরের পুরানো। তখন সারা পৃথিবী পাপে পরিপূর্ণ ছিল। সৃষ্টিকর্তা সামান্য কিছু নির্বাচিত মানুষ ও পশুপাখি ছাড়া সব কিছু এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় ধ্বংস করে দেন। এ কাহিনী প্রায় কম বেশি সবারই জানা। ধর্মগ্রন্থ আর অনেক পৌরাণিকে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। পবিত্র কোরআনের সুরা হুদে বলা হয়েছে, পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গের মধ্যে এ (নৌকা) তাদের নিয়ে বয়ে চলল, নুহ তার পুত্রকে (যে তাদের ডাকে পৃথক ছিল) ডেকে বললেন, হে বৎস আমাদের সঙ্গে আরোহন করো এবং অবিশ্বাসী কাফেরদের সঙ্গী হয়ো না। সূরা হুদে এ বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, (আল্লাহর শাস্তি প্রদান ও কাফেরদের ধ্বংসের পর) বলা হল, হে পৃথিবী, তুমি পানি শোষণ করে নাও এবং হে আকাশ, তুমি ক্ষান্ত হও। এরপর বন্যা প্রশমিত হল এবং কার্য সমাপ্ত হল, নৌকা জুদি পর্বতের উপর স্থির হল এবং বলা হল ধ্বংসই সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়েরর পরিণাম। ১৯১৬ সালের ঘটনা। রাশিয়ার গোয়েন্দা বিমান নিয়ে আকাশে চক্কর দিচ্ছিলেন লেফটেনেন্ট রস্কোভিতস্কি। সকালের সোনারোদে আরারাত পর্বতের চূড়ায় ঝকমক করছে বরফের স্তর। হঠাৎ কী যেন চোখে পড়তেই নড়েচড়ে বসলেন লেফটেনেন্ট। পাহাড়চূড়ায় আছে বিশাল এক হিমবাহ হ্রদ। সেখানেই পুরনো জাহাজের মতো কিছু একটা চোখে পড়ল তার। খবরটা ছড়িয়ে পড়ল দেশের আনাচে-কানাচে। সবার ধারণা, নুহ নবীর সেই বিখ্যাত জাহাজ খুঁজে পেয়েছেন লেফটেনেন্ট রস্কোভিতস্কি। এ জাহাজে চড়ে নুহ নবী ও তার সঙ্গীরা মহাপ্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। দলে দলে মানুষ এসে হাজির হল আরারাত পর্বতের গোড়ায়। পাহাড় তন্ন তন্ন করে তারা খুঁজে বের করল সেই জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। শুরু হল ছবি তোলা আর প্রমাণ সংগ্রহের প্রাণান্তকর চেষ্টা। কিন্তু সবকিছু করে ফেলার আগেই রাশিয়ায় শুরু হয়ে গেল বিপ্লব আর গৃহযুদ্ধ। বিপ্লবের উত্তেজনায় তখনকার মতো চাপা পড়ে যায় নুহ নবীর জাহাজের বিষয়টি। ১৯৫৩ সালে জেফারসন গ্রিন নামের এক প্রকৌশলী হেলিকপ্টারে আরারাত পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় দেখতে পেলেন বড়সড় চৌকো আকৃতির এক বাক্স ঝুলে আছে খাড়া পাহাড়ের কিনারা ঘেঁষে। তিনি কিছু ছবি তুলে আনেন। আবার আলোচনায় চলে আসে নুহ নবীর নৌকা।১৯৫৫ সালে ফরাসি পর্বতারোহী ফার্নান্স নাভারা আরারাত পাহাড়ে উঠতে গিয়ে বহু প্রাচীন কিছু কাঠের টুকরো পান। কালো রঙের ফসিল হয়ে যাওয়া সেই কাঠের টুকরো স্পেনের গবেষণাগারে পরীক্ষা করে জানা যায় প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরানো। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস কমিটির সদস্য ফ্রাঙ্ক মস জানালেন উপগ্রহ থেকে পওিয়া আরারাত পর্বতমালায় যে নৌকার আকৃতি দেখা যায় সম্ভবত ওটাই নুহ (আ)-এর নৌকা।

 

 তুরস্ক সরকারের নিরাপত্তার কড়াকড়ি আর রাশিয়ানদের হুমকিতেও খোঁজার গতি কমেনি। এখন পর্যন্ত সেই জাহাজ নিয়ে কৌতূহল আর আগ্রহ আছে আগের মতোই। ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত যে জাহাজে চড়ে নুহ নবী মহাপ্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন সেটি ছিল কাঠের তৈরি বিশাল এক জলযান। শোনা যায়, কম করে হলেও এটির দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫০ ফুট ও প্রস্থ ৭৫ ফুট। ভেতরের ডেকসহ এটির উচ্চতা ছিল ৪৫ ফুট। বিংশ শতাব্দীর আগে নির্মিত সবচেয়ে বড় জলযান হিসেবে স্বীকৃত এ জলযান। এর নির্মাণকৌশল আর নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল সময়ের তুলনায় অনেক আধুনিক। শোনা যায়, মহাপ্লাবনের শেষে আরারাত কিংবা জুদাই পর্বতের আশপাশে কোথাও নোঙর ফেলেছিল সেই জাহাজ। তবে এদিক থেকে আরারাত পর্বতের পাল্লাই বেশি ভারি। গত দেড়শ’ বছরে অসংখ্য মানুষ দাবি করেন, তারা নুহ নবীর জাহাজ খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে হলিউডি সিনেমা ‘ইন সার্চ অব নোহাস আর্ক’ মুক্তি পায়। এটি মুক্তি পাওয়ার পর আবার পৃথিবী জুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, নুহ নবীর জাহাজের খোঁজ মিলেছে। গুজবের মূল উৎস হল একটি ফটোগ্রাফ। মানুষ সেটা নিয়েই ব্যাপক হইচই করতে থাকে। পরে অবশ্য দেখা যায়, ছবিটি একটি বিচিত্রদর্শন পাথর ছাড়া আর কিছু নয়। এরকম ঘটনা শুধু একবার নয়, অসংখ্যবার ঘটেছে। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই চলছে এই খোঁজার পালা। তবে আজ পর্যন্ত মীমাংসা হয়নি এ রহস্যের। অসংখ্য অভিযাত্রী, পর্যটক আর প্রত্নতত্ত্ববিদের ধারণা, নুহ নবীর সেই জাহাজ আজও লুকিয়ে আছে আরারাত পর্বতের গভীর কোনো বরফ স্তরের আড়ালে। আর কোনো একদিন হয়ত সত্যি সত্যি এ জাহাজের রহস্য উন্মোচিত হবে।
আল্লাহর গজব নাজিল হয় যে কারনে
                                  

বনি ইসরাইলের প্রতি নির্দেশ ছিল যে, তোমরা যখন পবিত্র নগরীতে প্রবেশ করবে তখন তোমরা বিনয় ও নম্রতার সহিত ক্ষমা প্রার্থনা করবে। অনন্তর তারা ক্ষমা না চেয়ে তার কথা বিপরীত করে। যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি আজাব ও গজব নাজিল করেন। আল্লাহ বলেন-

অতপর জালেমরা কথা পাল্টে দিয়েছে, যা কিছু তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল তা থেকে। তারপর আমি  আসমান থেকে যালেমদের উপর আজাব অবতীর্ণ করেছি, আমার নির্দেশ লংঘন করার কারণে। (সুরা বাক্বারা : আয়াত ৫৯)

বনি ইসরাইল যখন মান্না-সালওয়ার পরিবর্তে খাবার চাইলো, তখন আল্লাহ তাদেরকে পবিত্র নগরীতে প্রবেশের নির্দেশ দেন এবং حطة হিত্তাহ বা ক্ষমা চাইতে। কিন্তু তারা হিত্তার পরিবর্তে حنطة হিনতাহ বললো অর্থাৎ গম চাইলো। যা ছিল আল্লাহর নির্দেশের সরাসরি বরখেলাফ। তাই আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের উপর একটি আসমানি বিপদ অবতীর্ণ করলো। কেননা তারা আদেশ অমান্য করেছিল।

বিপদের ব্যাখ্যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ বিপদ ছিল প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব। এ মহামারীর কারণে মাত্র এক ঘণ্টা সময়ে বনি ইসরাইল জাতির ৭০ হাজার লোক মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এ শাস্তির কারণ ছিল এই যে-

ক. তাদেরকে বলা হয়েছিল বিনীতভাবে নগরে প্রবেশ করতে। কিন্তু তারা গর্বভরে শির উঁচু করে প্রবেশ করে।

খ. তাদেরকে বলা হয় সিজদারত অবস্থায় প্রবেশ কর। কিন্তু তারা সেই স্থলে নিতম্বের উপর ভর করে উক্ত নগরে প্রবেশ করে।

গ. তাদেরকে বলা হয় হিত্তাহ বলতে তারা বলে হিনতাহ।

পর্যটক টানছে থাইল্যান্ডের মসজিদগুলো
                                  

থাইল্যান্ডে প্রায় সাত কোটি জনসংখ্যার প্রতি ২০ জনের একজন মুসলমান। দেশটিতে ৯৫ লাখের বেশি মুসলমান রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই বাস করেন গ্রামাঞ্চলে। মুসলিমরা থাইল্যান্ডের বৃহত্তম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। আরব ব্যবসায়ী এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলিম অভিযানের মাধ্যমে এদেশে ইসলামের বিস্তার ঘটে।

থাইল্যান্ডের মুসলিম প্রধান তিনটি রাজ্য হলো- পাত্তানি, নারাথিওয়াট ও ইয়ালা। এই তিনটি প্রদেশে থাইল্যান্ডের মোট মুসলিম জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ বাস করেন। বিগত এক শতাব্দী আগে থাইল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি স্বাধীন মুসলিম সালতানাত হিসেবে পরিচিত ছিল। এ ছাড়া মালয়েশিয়া সংলগ্ন সাতুন প্রদেশেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

থাইল্যান্ড সম্পর্কে অনেকেরই খারাপ ধারণা আছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে যা প্রয়োজন সবই এখানে আছে। এত কিছুর পরও আশার কথা হলো, থাইল্যান্ডে সাম্প্রতিক সময়ে ‘আল ফাতুনি’ নামে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চালু হয়েছে ইসলামি ব্যাংক ‘ইসলামি ব্যাংক অব থাইল্যান্ড।’ যার বেশিরভাগ গ্রাহকই হচ্ছেন অমুসলিম। আর ব্যাংকটির ডিপোজিটও সন্তোষজনক বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। তা ছাড়া থাইল্যান্ডে হালাল ফুড ইন্ডাস্ট্রিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের সেরা ‘রেড বোল’ নামে এই পানীয়টিও হালাল ফুড ইন্ডাস্ট্রিজেরই একটি পণ্য।আরও মজার বিষয় হলো, এখন থাইল্যান্ডের মসজিদগুলোও পর্যটকদের টানছে। অন ইসলামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডে বেড়াতে যাওয়া প্রায় ১০ শতাংশ পর্যটক বেশ ঘটা করে ঐতিহাসিক মসজিদগুলো দেখতে যান। ফলে ওই সব মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে খাবার ও হালকা শখের জিনিস বেচাকেনার দোকান।

থাইল্যান্ডে হালাল খাবারকে আরও জনপ্রিয় করতে সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ওই দেশে অবস্থিত কাতার দূতাবাসের উদ্যোগে হালাল খাদ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

এ প্রদর্শনীর অবকাশে পবিত্র কোরআনে কারিম তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন গ্রুপে অনুষ্ঠিত এ কোরআন প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব ছিলেন থাইল্যান্ড ও আল আজহার ইসলামি কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা।

থাইল্যান্ডে বসবাসরত মুসলমানদেরকে কোরআনে কারিম হেফজ, তেলাওয়াত এবং হাদিস পাঠের প্রতি উৎসাহ প্রদান ও গবেষণার প্রতি উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতাটির ব্যবস্থা করা হয়। এমন একটি সুন্দর অনুষ্ঠান অায়োজনের জন্যে প্রতিযোগিতা আয়োজনকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন থাইল্যান্ডে নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত।৫ টি গ্রুপে বয়সভিত্তিক এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রতি গ্রুপের বিজয়ী প্রতিদ্বন্দীদের বিভিন্ন অংকের নগদ অর্থ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

থাইল্যান্ডে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মসজিদ (৩ হাজার ৪ শ’ ৯৪টি) রয়েছে। এর মাঝে প্রাচীন কয়েকটি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় ৩শ’ বছর পূর্বে। এসব মসজিদের প্রায় সবগুলোর সঙ্গেই রয়েছে মাদ্রাসা। হাল সময়ে থাইল্যান্ডে তাবলিগের কাজ এগিয়ে চলছে প্রচণ্ড গতিতে।

রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় উৎসবগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবেই পালন করতে পারেন। দুই ঈদে সরকারি ছুটি না থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে খুব সহজেই ছুটি নেওয়া যায়। রোজার সময় এখানকার মুসলমানরা একসঙ্গে মসজিদে ইফতারের আয়োজন করতে পারেন। সেই সঙ্গে তারাবি ও ঈদের নামাজও। অনেক মসজিদে জুমার দিন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। থাই মিষ্টি, ভাত, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, বিভিন্ন রকমের ফল ও কোকাকোলা দিয়ে আগত মুসল্লিদের আপ্যায়ন করা হয়। এটা তাদের আন্তরিকতার প্রকাশই বটে। আমরা প্রত্যাশা করি, থাইল্যান্ডের মুসলমানরা পরস্পরে এমন আন্তরিকতা ও মমতায় জড়িয়ে থাকুক যুগ-যুগান্তর।


সন্তান-সন্তুতির প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা
                                  

সন্তানের প্রতি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা মানুষের সহজাত। ভালোবাসার শক্ত এ ভিতের ওপরই টিকে আছে মানবজাতি, দাঁড়িয়ে আছে মানবসভ্যতা। মমতার গভীর এ মেলবন্ধন না থাকলে অন্যান্য জীবগোষ্ঠীর মতো হয়তো মনুষ্য জাতিও এতোদিন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতো।

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার প্রপাঢ় ভালোবাসার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জেনে রেখো! নিশ্চয় সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি (এর মোহ ও মমতা) তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা।’ -সূরা আনফাল : ২৮

অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।’ -সূরা কাহাফ : ৪৬

এ ছাড়াও পবিত্র কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা সন্তানের প্রতি নবীদের স্নেহ ও মমতার একাধিক দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। যেমন, প্রিয় সন্তান হজরত ইউসুফকে হারিয়ে হজরত ইয়াকুবের ব্যাকুলতার বর্ণনা। সন্তানের জন্য কাঁদতে কাঁদতে তার দৃষ্টিশক্তি পর্যন্ত লোপ পায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং সে বললো, আফসোস ইউসুফের জন্য! শোকে তার দু’চোখ সাদা হয়ে গেছে এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট। তারা বললো, আল্লাহ শপথ! আপনি ইউসুফের কথা ভুলবেন না, যতোক্ষণ না আপনি মুমূর্ষ হবেন অথবা মৃত্যুবরণ করবেন।’ -সূরা ইউসুফ : ৮৪-৮৫

দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরও সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা ও মমতা ছিলো অক্ষুণœ। পুত্র ইউসুফের শরীরের গন্ধ পর্যন্ত তিনি তখনও ভুলেননি। তার শরীরের গন্ধ টের পেয়ে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় আমি ইউসুফের গন্ধ পাচ্ছি।’ -সূরা ইউসুফ : ৯৪

একইভাবে বিপদগামী সন্তানের ধ্বংস দেখে হজরত নুহ (আ.)-এর পিতৃহৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি আল্লাহর দরবারে আকুতি জানান, ‘হে আমার প্রভু! আমার ছেলে তো আমার পরিবারভুক্ত। আর তাদের (রক্ষার) ব্যাপারে আপনার অঙ্গীকারও সত্য। নিশ্চয় আপনি সর্বোচ্চ ন্যায় বিচারক।’ -সূরা হুদ : ৪৫

সন্তান যেমনই হোক পিতা-মাতার অন্তরে তাদের জন্য স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসার একটি জায়গা সব সময় থাকেই। তারা সব সময় সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন।

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও ছিলেন তার সন্তান-সন্তুতি ও পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল। তিনি তার সন্তানদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তুলনায় পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক স্নেহ-মমতা পোষণকারী আর কাউকে দেখিনি।’ -আল আদাবুল মুফরাদ : ৩৭৬

হজরত রাসূলে আকরাম (সা.) ৭ সন্তানের জনক ছিলেন। তন্মধ্যে ৩ ছেলে হলো- কাসেম, ইবরাহিম ও আবদুল্লাহ। আর মেয়ে ৪ জন হলো- জায়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা। ছেলেদের সবাই শৈশবে মারা যান। মেয়েদের মধ্যে হজরত ফাতেমা (রা.) ব্যতীত সবাই রাসূল (সা.)-এর পূর্বেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

হজরত ফাতেমা (রা.)-এর দুই পুত্র হজরত হাসান ও হোসাইন (রা.)-এর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর বংশের বিস্তৃতি ঘটে। রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর ৬ মাস পর হজরত ফাতেমা (রা.)ও ইন্তেকাল করেন। -মাওলানা আকবর শাহ খান নজিবাবাদী, ইসলামের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২২৮ সন্তান জন্মের সংবাদে রাসূল (সা.) আনন্দিত হতেন। হজরত আবু রাফে (রা.) যখন রাসূল (সা.) কে তার পুত্র ইবরাহিমের জন্মের সংবাদ দেন, তখন তিনি খুশি হয়ে তাকে একজন দাস বা সেবক দান করেন।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সন্তানদের নাম রাখেন। শুধু সন্তান নয় নাতি-নাতনির জন্যও সুন্দর সুন্দর নাম নির্বাচন করেন তিনি। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, হাসান জন্মগ্রহণ করলে আমি তার নাম রাখি ‘হারব’। অতপর রাসূল (সা.) আসলেন এবং বললেন, আমাকে আমার নাতি দেখাও। তোমরা তার কী নাম রেখেছো? হজরত আলি (রা.) বলেন, আমি বললাম, হারব।’ রাসূল (সা.) বললেন, না। তার নাম হাসান।’ -মুসনাদে আহমদ : ৭৬৯

রাসূল (সা.) তার সন্তান এবং নাতিদের জন্মের পর তাদের চুলের ওজনে রৌপ্য দান করেন এবং সবার নামে আকিকা করেন। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকিকা করেন। এবং বলেন, ফাতেমা! হাসানের মাথা মুড়িয়ে দাও এবং তার চুলের সমপরিমাণ রৌপ্য সদকা করো।’ -সুনানে তিরমিজি : ১৫১৯

শত ব্যস্ততার মাঝেও রাসূল (সা.) তার সন্তানদের আদর-যত্ন করতেন এবং খোঁজ-খবর রাখতেন। তাদেরকে কোলে তুলে আদর করতেন। চুমু খেতেন; এমনকি তাদের শরীরের ঘ্রাণ নিতেন।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তুলনায় পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক স্নেহ-মমতা পোষণকারী আর কাউকে দেখিনি। তার এক পুত্র (ইবরাহিম) মদিনার উপকণ্ঠে দুধ পান করতো। তার দুধমা ছিলো কায়না। আমরা তার কাছে যেতাম। ...রাসূল (সা.) তাকে চুমু খেতেন এবং তার ঘ্রাণ নিতেন।’ -আল আদাবুল মুফরাদ : ৩৭৬

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদা (রা.) স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহকে দেখেছি, তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন। অতপর হাসান ও হুসাইন (রা.) তার সামনে আসলো। তাদের গায়ে ছিলো লাল জামা। তারা পা পিছলে পরে যাচ্ছিলো আর দাঁড়াচ্ছিলো। রাসূল (সা.) নামলেন এবং তাদের দু’জনকে ধরে কোলে বসালেন। অতপর রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহ সত্যই বলেছেন, নিশ্চয় সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আমি এ দু’জনকে দেখে নিজেকে সংবরণ করতে পারিনি। এরপর পুনরায় খুতবা শুরু করলেন।’ -সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০০

রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতা শুধু ছেলে শিশুর জন্য ছিলো না; বরং তিনি তার পরিবারের কন্যা শিশুকেও সমান ভালোবাসতেন। হজরত আবু কাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয় রাসূল (সা.) নামাজ আদায় করছিলেন। তার কোলে ছিলো- আবুল আস ইবনে রাবিআহ ও রাসূল (সা.)-এর মেয়ে জয়নব (রা.)-এর সন্তান উমামা। নবী করিম (সা.) সেজদা যাওয়ার সময় তাকে নামিয়ে রাখছিলেন এবং সেজদা থেকে দাঁড়িয়ে তাকে কোলে নিচ্ছিলেন।’ -সহিহ বুখারি : ৫১৬

রাসূল (সা.) নিজে যেমন কন্যা সন্তানকে অবহেলা করতেন না, তেমনি কেউ পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যা সন্তানকে অবহেলা করলে রাসূল (সা.) তাকে সতর্ক করতেন। হজরত আনাসা (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বসাছিলো। এ সময় তার পুত্র সন্তান তার কাছে এলো। সে তাকে চুমু দিলো এবং কোলে তুলে নিলো। এরপর তার কন্যা সন্তান এলো এবং সে তাকে সামনে বসিয়ে দিলো। এ দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, এদের উভয়ের সঙ্গে একই রকম আচরণ করলে না কেনো?’ -মুসনাদে বাজ্জার : ৬৩৬১

সন্তান-সন্তুতি কান্না করলে রাসূল (সা.) বিচলিত হতেন। তাদেরকে কোলে তুলে নিয়ে শান্ত করতেন। একবার রাসূল (সা.)-এর কানে হজরত হোসাইন (রা.)-এর কান্না এলো। এতে তিনি ভীষণ ব্যথিত হলেন। তিনি হজরত ফাতেমা (রা.) কে বললেন, তুমি কী জান না তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয়।’ -দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃষ্ঠা-১২৪

কন্যাদের সঙ্গে রাসূল (সা.) এর সুগভীর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। সুখে দুঃখে তিনি তাদের পাশে থাকতেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নিতেন। তাদের সুখে তিনি আনন্দিত হতেন এবং দুঃখে ব্যথিত হতেন। তাদেরকে সান্তনা দিতেন। কখনও তারা রাসূল (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হলে আদর করে পাশে বসাতেন এবং একান্ত আলাপচারিতায় মেতে উঠতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ফাতেমা হেঁটে আসলো। তার হাঁটার ভঙ্গিটা ছিলো যেনো রাসূল (সা.)-এর হাঁটার মতো। রাসূল (সা.) বললেন, আমার কন্যাকে অভিনন্দন। অতপর তিনি ফাতেমাকে তার ডান বা বাম পাশে বসালেন। নবী (সা.) তাকে গোপন কোনো কথা বললেন, ফলে সে কাঁদলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কাঁদছো কেনো? অতপর রাসূল (সা.) তাকে আরেকটি গোপন কথা বললেন, ফলে সে হাসলো।’ -সহিহ বোখারি : ৩৬২৩

হজরত ফাতেমা (রা.) ছিলেন নবী করিম (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। তার ব্যাপারে নবী করিম (সা.) বলতেন, ফাতেমা আমার দেহের একটি অংশ। যাতে তার কষ্ট হয়, তাতে আমারও কষ্ট হয়।’ -সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভি রহ., নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা- ৪২৩

বিয়ের পরও রাসূল (সা.) তার কন্যাদের প্রতি লক্ষ রাখতেন। তাদের ভালো-মন্দের খোঁজ রাখতেন। বদর যুদ্ধে যাওয়ার সময় তার কন্যা হজরত রুকাইয়া (রা.) অসুস্থ ছিলেন। তার সেবা-যত্নের জন্য স্বামী হজরত উসমান (রা.) কে মদিনায় রেখে যান। -সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভি রহ., নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা- ৪২৪

এমনিভাবে তার কন্যা হজরত জয়নব (রা.) স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে মায়ের দেওয়া হার মদিনায় পাঠিয়ে দেন। রাসূল (সা.) হারটি দেখে স্মৃতিকাতর হন এবং তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠেন। অতপর সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর সঙ্গে আলোচনা করে শুধু হারটি ফেরত দেন। -সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভি রহ., সীরাতে রাসূল আকরাম সা., পৃষ্ঠা- ১১৩

হজরত ফাতেমা (রা.) ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর বাকি সব সন্তান তার জীবদ্দশায়ই মারা যান। পিতা হিসেবে রাসূল (সা.)-এর জন্য এ ছিলো সীমাহীন কষ্টকর এক অভিজ্ঞতা এবং ঈমানি পরীক্ষা। তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। রাসূল (সা.) তার সন্তানদের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছেন এবং কেঁদেছেনও। কিন্তু তিনি এমন কোনো আচরণ করেননি যাতে আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়; তিনি তার সব কষ্টকে ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। রাসূল (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিম মারা গেলে তিনি বলেন, ‘আমাকে না দেখিয়ে তাকে কাফন পরিও না। অতপর তিনি আসেন এবং তার প্রতি ঝোঁকেন ও কাঁদেন।’ -সুনানে ইবনে মাজা : ১৪৭৫

অশ্রসিক্ত নয়নে রাসূল (সা.) বলেন, ‘আমরা তোমার বিচ্ছেদে ব্যাথিত। চোখ অশ্রু ঝরাচ্ছে এবং অন্তর বিষাদগ্রস্থ। আমরা এমন কোনো কথা বলবো না যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।’ -কানজুল উম্মাল : ৪২৪৫০

রাসূল (সা.) নিজেই শুধু সন্তান-সন্তুতি ও পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসেননি; বরং তিনি প্রতিটি মুমিনকে সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা শিশুদেরকে ভালোবাস এবং তাদের প্রতি দয়া করো। তাদের সঙ্গে কোনো ওয়াদা করলে তা পূর্ণ করো। কেননা তারা তোমাদেরকে তাদের রিজিক সরবারহকারী বলে জানে।’ -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

সুতরাং প্রতিটি মুমিনের জন্য দায়িত্ব হলো, জীবনের সৌন্দর্য ও সম্পদ সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হওয়া এবং তাদেরকে কল্যাণকামিতার সঙ্গে প্রতিপালন করা।

   Page 1 of 1
     আইনশৃংখলা
ইসলাম, নারী এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ "গোলাম মাওলা রনি"
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
নুহ নবীর নৌকার খোঁজে
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
আল্লাহর গজব নাজিল হয় যে কারনে
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
পর্যটক টানছে থাইল্যান্ডের মসজিদগুলো
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
সন্তান-সন্তুতির প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......