মত-দ্বিমত -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

একটি বাম বুর্জোয়া সংসদীয় দল হিসেবে সিপিএম তিন দশকের বেশি সময় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল। কমিউনিস্ট নাম ধারণ করে থাকলেও ভারতের সাংবিধানিক আইন-কানুন মান্য করেই তাদের ক্ষমতায় থাকতে হয়েছিল। এ কারণে ক্ষমতায় গিয়ে বর্গাদারদের জন্য কিছু অধিকার নিশ্চিত করলেও এবং দখলের ভাগ বৃদ্ধি করলেও তার থেকে বেশি কিছু করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। নীতিগতভাবে সিপিএম নেতৃত্ব ভূমি সংস্কার আরও এগিয়ে নিতে নিজেরা কতখানি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল এ প্রশ্ন বাদ দিয়েও বলা চলে যে, ভারতীয় সংবিধানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার যেভাবে রক্ষিত আছে তাকে খর্ব বা ক্ষুণ্ণ করে কোনো প্রকৃত ভূমি সংস্কার তারা করতে পারেনি। শ্রমিকদের জন্যও তারা প্রকৃতপক্ষে কিছু করেনি। পুঁজি ও শ্রমের সম্পর্ক ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে যেভাবে ছিল এবং এখনও আছে, সিপিএমের আমলেও সে রকমই ছিল। কাজেই এদিক দিয়ে বোঝার উপায় ছিল না যে, পশ্চিমবঙ্গে কোনো কমিউনিস্ট পার্টির শাসন আছে। উপরন্তু সরকারি ক্ষমতায় সিপিএম বহু ক্ষেত্রেই শ্রমিকের পরিবর্তে মালিকের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শোষণের মাত্রা কমেনি। তাছাড়া বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জন্য অনেক কলকারখানা পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

 

ক্ষমতায় থাকার সময় সিপিএম ক্রমেই শাসকশ্রেণীর স্বার্থের দিকেই বেশি করে ঝুঁকছিল। এমনভাবে ঝুঁকছিল যে, সিপিএমকে ভয় করার কোনো কারণ তাদের ছিল না। সিপিএম আসলে নিজেই নিজের কারাগারে বন্দি হয়েছিল। যদি কোনো রাজনৈতিক দল দৃঢ়ভাবে স্থির করে যে, ক্ষমতায় যেভাবে হোক তাকে থাকতেই হবে, তাহলে তাকে অনেক রকম কাজ করতে হয়। প্রথমত, তাকে কাজ করতে হয় বিশ্বস্ততার সঙ্গে দেশের সংবিধান মান্য করে। সিপিএম সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাকে কাজ করতে হবে কোনো বিপ্লবী শক্তির বিকাশ ঘটানোর জন্য নয়, উপরন্তু বিপ্লবী শক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে শাসকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য। সিপিএম তা-ই করেছিল। এর জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজির খেদমতে তাদের থাকতে হয়েছিল। এ অবস্থায় একদিকে কৃষকদের স্বার্থরক্ষা এবং তাদের আরও নতুন অধিকার দেয়ার উদ্দেশ্যে ভূমি সংস্কার এগিয়ে নেয়া, কৃষি সমবায় গঠন করা ইত্যাদির ধারেকাছে তারা যায়নি। ভূমি সংস্কার এমন জিনিস যা শুরু করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তাকে ক্রমেই ঠেলে এগিয়ে নিতে হয়। এ কাজ করার ক্ষমতা সিপিএমের ছিল না। কারণ তারা স্থির করেছিল, যেমন করেই হোক, তাদের ক্ষমতায় থাকতে হবে এবং তার জন্য ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে শুধু শাসকশ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণই নয়, নিজেও পুরোপুরি শাসকশ্রেণীর অংশে পরিণত হতে হবে। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সিপিএম এই পথ ধরেই সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে পৌঁছেছিল। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম নির্বাচনের পর নির্বাচন জিতে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল।

কমিউনিস্ট পার্টি নাম ধারণ করে নির্বাচনের মাধ্যমে সিপিএম যত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তার মতো রেকর্ড আর কোনো দেশে কোথাও আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এদিক দিয়ে তাদের কৃতিত্ব আছে। কিন্তু তাহলেও এই দীর্ঘ শাসনকালে জনগণকে এমন উল্লেখযোগ্য কিছু তারা দিতে পারেনি, যা নিয়ে কোনো কমিউনিস্ট গর্ব করতে পারে। কল্যাণ রাষ্ট্র নামে পরিচিত অনেক বুর্জোয়া রাষ্ট্রে সরাসরি মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবন-জীবিকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি পেয়েছে। অন্যদিকে সিপিএম সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষক এলাকায় শিল্পোন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি পুঁজির খেদমত করতে গিয়ে জনগণের প্রতি যে নিষ্ঠুরতার নিদর্শন রেখেছিল, তার প্রতিশোধই জনগণ নিয়েছিলেন ২০১১ সালের রাজ্য নির্বাচনে। ১৯৭৭ সালের পর বড় আকারে পরাজিত হয়ে তারা ক্ষমতা হারিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল, তাদের এই পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না! এ কারণে নির্বাচনের পর ফলাফল গুনতি করার সময়েও তাদের পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, তারাই জয়লাভ করে আবার ক্ষমতাসীন হবে!

দীর্ঘদিন শাসন করার পর ক্ষমতা হারিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো কারও পক্ষে সহজ নয়। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার পরাজিত হওয়ার পর বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় গিয়েছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর কংগ্রেস আরও কয়েক বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু যে অবক্ষয়ের কারণে কংগ্রেস ১৯৭৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল সেই সাংগঠনিক অবক্ষয়ের কারণে এবং ভারতে বুর্জোয়া শ্রেণী আরও বেশি করে দক্ষিণে মোড় নেয়ার পরিণতিতে কংগ্রেসের পরিবর্তে এখন ভারতে আরএসএসের মতো হিন্দুত্ববাদী চরম প্রতিক্রিয়াশীলরা বিজেপি গঠন করে ক্ষমতাসীন হয়েছে। শুধু ক্ষমতাসীন হয়েছে তাই নয়, তারা ভারতের রাজনীতিতে ধর্মবিযুক্ততার (Secularism) বিনাশ সাধন এমনভাবে করেছে যা আগে কোনোদিন দেখা যায়নি, যদিও কংগ্রেস শাসন বাহ্যত ধর্মবিযুক্ততার কথা বললেও তারাও প্রকৃতপক্ষে একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই মুসলমান সংখ্যালঘুদের জন্য কিছুই করেনি, উপরন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাদের প্রান্তিকীকরণ ঘটিয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের যে অবস্থা ছিল তার তুলনায় মুসলমানদের অবস্থার অবিশ্বাস্য অবনতি ঘটেছিল। কংগ্রেস সরকারের দ্বারা গঠিত সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মুসলমানদের অবস্থা ভারতে দলিতদের থেকেও খারাপ! কাজেই এটা ঠিক নয় যে, কংগ্রেস একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মবিযুক্ত দল ছিল এবং হঠাৎ করে ভারতে বিজেপি আকাশ থেকে নেমে এসে ক্ষমতা দখল করেছে। কংগ্রেস যে সাম্প্রদায়িক নীতি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত অনুসরণ ও কার্যকর করে এসেছে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী শাসন তারই অপরিহার্য পরিণতি।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তিন দশকের বেশি শাসনক্ষমতায় থেকে মুসলমানদের জন্য কিছুই করেনি। এমনকি সাচার কমিটির রিপোর্টও তারা বিবেচনা ও গ্রহণ করেনি। যেমন তারা বিবেচনা ও গ্রহণ করেনি দলিতদের অবস্থার বিষয়ে গঠিত মণ্ডল কমিশনের বিখ্যাত রিপোর্ট। অন্য কথা বাদ দিয়েও দেখা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের চাকরির অবস্থা কংগ্রেসের সময় যা ছিল, সিপিএমের সময়েও তাই-ই ছিল। মুসলমানদের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ হলেও চাকরি ছিল ২ শতাংশেরও কম। তবে একেবারে শেষের দিকে এসে তারা মুসলমানদের জন্য ১০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। সেই অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেস আমলে মুসলমানদের চাকরির অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে, যদিও জনসংখ্যার তুলনায় তা সামান্যই।

কংগ্রেস এবং সিপিএমের সুদীর্ঘ শাসন আমলে পশ্চিমবঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুসলমানরা স্বাধীন ভারতে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে যথেষ্ট পিছিয়ে গেছেন। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও মুসলমানদের কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি কোথাও নেই। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সঙ্গীত, নাটক, সাহিত্য- সব ক্ষেত্রেই প্রায় একই অবস্থা। এসব দেখে মনে হয় না যে, পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ মুসলমান। খুব সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক নীতি ছাড়া এটা কিছুতেই সম্ভব হতো না। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, সাম্প্রদায়িকতার অর্থ শুধু দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধানো নয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য সৃষ্টি করা এবং তা কমিয়ে না এনে রক্ষা করা বা বাড়িয়ে তোলা হল সাম্প্রদায়িকতার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিএমের শাসনের সঙ্গে এদিক দিয়ে কংগ্রেস শাসনের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্যই নির্দেশ করা যাবে না। কমিউনিস্ট পার্টি সাম্প্রদায়িক এ কথা বললে বা শুনলে সাধারণভাবে মানুষের আঁতকে ওঠার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সিপিএম সরকার যে আচরণ করেছে তাকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিলে সত্যের কোনো অপলাপ হয় না। তবে এ প্রসঙ্গে এটা অবশ্যই জোরের সঙ্গে বলা দরকার যে, সিপিআই বা সিপিএম কোনো সময়ে তাদের কথাবার্তা বা প্রচার-প্রচারণায় সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার করেনি। তারা অসাম্প্রদায়িকতাই প্রচার করেছে এবং পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি হতে দেয়নি এবং কোনো জায়গায় সে পরিস্থিতির সম্ভাবনা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তার মোকাবেলা করেছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ধর্মবিযুক্ত নীতি গ্রহণ না করে তার বিপরীত পথ ধরে অগ্রসর হলে যা হয় তাই হয়েছে। সিপিএমের দীর্ঘ শাসন পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রতিরোধ শক্তির জন্মদান করতে পারেনি যাতে সাম্প্রদায়িতার প্রকাশ্য প্রচার ও তার পরিণতিতে হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঠেকিয়ে রাখা যায়। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গে এখন সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ বিজেপির হাত ধরে ঘটে চলেছে। যেভাবে আরএসএস মার্কা হিন্দুত্ববাদী প্রচার পশ্চিমবঙ্গে চলছে, তাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শর্ত সেখানে বেশ ভালোভাবে ও দ্রুতই তৈরি হচ্ছে, যা মোকাবেলা করার ক্ষমতা সিপিএমের নেই।

পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা অন্যদের তুলনায় ভালো। আগে যে মুসলমানরা কংগ্রেস ও সিপিএমকে ভোট দিত, তারা বিগত দুই নির্বাচনে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। বিপদের মুখে পড়ে খড়কুটো ধরার মতো অবস্থাতেই তারা এটা করেছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এখন পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে পুলিশ ও তাদের ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী দিয়ে এক ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তাতে তাদের জনপ্রিয়তা আর আগের মতো নেই। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকার মুখে সিপিএম বা বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ছে না। সেটা বিপজ্জনকভাবে ঘটছে বিজেপির ক্ষেত্রে। সাংগঠনিকভাবে তারা এখনও পশ্চিমবঙ্গে খুব দুর্বল, কিন্তু হিন্দুত্ববাদের প্রচার সেখানে জোরকদমে চলছে। হিন্দুত্ববাদের জনপ্রিয়তা অর্থাৎ চরম সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেয়ার মতো শর্ত পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে একদিকে যেমন সিপিএম ও বামফ্রন্টের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনি জয়ের সম্ভাবনা নেই বিজেপিরও। তবে তাদের ভোট যে বৃদ্ধি পাবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পরিণতিতে তারও পরবর্তী নির্বাচনে কোনোরকমে কাজ চলার মতো সংগঠন দাঁড় করিয়ে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় যদি বিজেপি সরকার গঠন করে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিশেষত এ কারণেও এটা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে যে, ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে নির্বাচনের মাধ্যমে হঠিয়ে দেয়ার ক্ষমতা যে কংগ্রেসসহ কোনো সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল বা তাদের জোটের আছে, এমন কোনো লক্ষণও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নেই।

৩০.০৯.২০১৭

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে
                                  

একটি বাম বুর্জোয়া সংসদীয় দল হিসেবে সিপিএম তিন দশকের বেশি সময় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল। কমিউনিস্ট নাম ধারণ করে থাকলেও ভারতের সাংবিধানিক আইন-কানুন মান্য করেই তাদের ক্ষমতায় থাকতে হয়েছিল। এ কারণে ক্ষমতায় গিয়ে বর্গাদারদের জন্য কিছু অধিকার নিশ্চিত করলেও এবং দখলের ভাগ বৃদ্ধি করলেও তার থেকে বেশি কিছু করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। নীতিগতভাবে সিপিএম নেতৃত্ব ভূমি সংস্কার আরও এগিয়ে নিতে নিজেরা কতখানি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল এ প্রশ্ন বাদ দিয়েও বলা চলে যে, ভারতীয় সংবিধানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার যেভাবে রক্ষিত আছে তাকে খর্ব বা ক্ষুণ্ণ করে কোনো প্রকৃত ভূমি সংস্কার তারা করতে পারেনি। শ্রমিকদের জন্যও তারা প্রকৃতপক্ষে কিছু করেনি। পুঁজি ও শ্রমের সম্পর্ক ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে যেভাবে ছিল এবং এখনও আছে, সিপিএমের আমলেও সে রকমই ছিল। কাজেই এদিক দিয়ে বোঝার উপায় ছিল না যে, পশ্চিমবঙ্গে কোনো কমিউনিস্ট পার্টির শাসন আছে। উপরন্তু সরকারি ক্ষমতায় সিপিএম বহু ক্ষেত্রেই শ্রমিকের পরিবর্তে মালিকের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শোষণের মাত্রা কমেনি। তাছাড়া বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জন্য অনেক কলকারখানা পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

 

ক্ষমতায় থাকার সময় সিপিএম ক্রমেই শাসকশ্রেণীর স্বার্থের দিকেই বেশি করে ঝুঁকছিল। এমনভাবে ঝুঁকছিল যে, সিপিএমকে ভয় করার কোনো কারণ তাদের ছিল না। সিপিএম আসলে নিজেই নিজের কারাগারে বন্দি হয়েছিল। যদি কোনো রাজনৈতিক দল দৃঢ়ভাবে স্থির করে যে, ক্ষমতায় যেভাবে হোক তাকে থাকতেই হবে, তাহলে তাকে অনেক রকম কাজ করতে হয়। প্রথমত, তাকে কাজ করতে হয় বিশ্বস্ততার সঙ্গে দেশের সংবিধান মান্য করে। সিপিএম সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাকে কাজ করতে হবে কোনো বিপ্লবী শক্তির বিকাশ ঘটানোর জন্য নয়, উপরন্তু বিপ্লবী শক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে শাসকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য। সিপিএম তা-ই করেছিল। এর জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজির খেদমতে তাদের থাকতে হয়েছিল। এ অবস্থায় একদিকে কৃষকদের স্বার্থরক্ষা এবং তাদের আরও নতুন অধিকার দেয়ার উদ্দেশ্যে ভূমি সংস্কার এগিয়ে নেয়া, কৃষি সমবায় গঠন করা ইত্যাদির ধারেকাছে তারা যায়নি। ভূমি সংস্কার এমন জিনিস যা শুরু করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তাকে ক্রমেই ঠেলে এগিয়ে নিতে হয়। এ কাজ করার ক্ষমতা সিপিএমের ছিল না। কারণ তারা স্থির করেছিল, যেমন করেই হোক, তাদের ক্ষমতায় থাকতে হবে এবং তার জন্য ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে শুধু শাসকশ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণই নয়, নিজেও পুরোপুরি শাসকশ্রেণীর অংশে পরিণত হতে হবে। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সিপিএম এই পথ ধরেই সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে পৌঁছেছিল। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম নির্বাচনের পর নির্বাচন জিতে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই তাদের সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল।

কমিউনিস্ট পার্টি নাম ধারণ করে নির্বাচনের মাধ্যমে সিপিএম যত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তার মতো রেকর্ড আর কোনো দেশে কোথাও আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এদিক দিয়ে তাদের কৃতিত্ব আছে। কিন্তু তাহলেও এই দীর্ঘ শাসনকালে জনগণকে এমন উল্লেখযোগ্য কিছু তারা দিতে পারেনি, যা নিয়ে কোনো কমিউনিস্ট গর্ব করতে পারে। কল্যাণ রাষ্ট্র নামে পরিচিত অনেক বুর্জোয়া রাষ্ট্রে সরাসরি মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবন-জীবিকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি পেয়েছে। অন্যদিকে সিপিএম সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষক এলাকায় শিল্পোন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি পুঁজির খেদমত করতে গিয়ে জনগণের প্রতি যে নিষ্ঠুরতার নিদর্শন রেখেছিল, তার প্রতিশোধই জনগণ নিয়েছিলেন ২০১১ সালের রাজ্য নির্বাচনে। ১৯৭৭ সালের পর বড় আকারে পরাজিত হয়ে তারা ক্ষমতা হারিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল, তাদের এই পরাজয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না! এ কারণে নির্বাচনের পর ফলাফল গুনতি করার সময়েও তাদের পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, তারাই জয়লাভ করে আবার ক্ষমতাসীন হবে!

দীর্ঘদিন শাসন করার পর ক্ষমতা হারিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো কারও পক্ষে সহজ নয়। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার পরাজিত হওয়ার পর বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে ইন্দিরা গান্ধী আবার ক্ষমতায় গিয়েছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর কংগ্রেস আরও কয়েক বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু যে অবক্ষয়ের কারণে কংগ্রেস ১৯৭৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল সেই সাংগঠনিক অবক্ষয়ের কারণে এবং ভারতে বুর্জোয়া শ্রেণী আরও বেশি করে দক্ষিণে মোড় নেয়ার পরিণতিতে কংগ্রেসের পরিবর্তে এখন ভারতে আরএসএসের মতো হিন্দুত্ববাদী চরম প্রতিক্রিয়াশীলরা বিজেপি গঠন করে ক্ষমতাসীন হয়েছে। শুধু ক্ষমতাসীন হয়েছে তাই নয়, তারা ভারতের রাজনীতিতে ধর্মবিযুক্ততার (Secularism) বিনাশ সাধন এমনভাবে করেছে যা আগে কোনোদিন দেখা যায়নি, যদিও কংগ্রেস শাসন বাহ্যত ধর্মবিযুক্ততার কথা বললেও তারাও প্রকৃতপক্ষে একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই মুসলমান সংখ্যালঘুদের জন্য কিছুই করেনি, উপরন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাদের প্রান্তিকীকরণ ঘটিয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের যে অবস্থা ছিল তার তুলনায় মুসলমানদের অবস্থার অবিশ্বাস্য অবনতি ঘটেছিল। কংগ্রেস সরকারের দ্বারা গঠিত সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মুসলমানদের অবস্থা ভারতে দলিতদের থেকেও খারাপ! কাজেই এটা ঠিক নয় যে, কংগ্রেস একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মবিযুক্ত দল ছিল এবং হঠাৎ করে ভারতে বিজেপি আকাশ থেকে নেমে এসে ক্ষমতা দখল করেছে। কংগ্রেস যে সাম্প্রদায়িক নীতি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত অনুসরণ ও কার্যকর করে এসেছে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী শাসন তারই অপরিহার্য পরিণতি।

পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তিন দশকের বেশি শাসনক্ষমতায় থেকে মুসলমানদের জন্য কিছুই করেনি। এমনকি সাচার কমিটির রিপোর্টও তারা বিবেচনা ও গ্রহণ করেনি। যেমন তারা বিবেচনা ও গ্রহণ করেনি দলিতদের অবস্থার বিষয়ে গঠিত মণ্ডল কমিশনের বিখ্যাত রিপোর্ট। অন্য কথা বাদ দিয়েও দেখা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের চাকরির অবস্থা কংগ্রেসের সময় যা ছিল, সিপিএমের সময়েও তাই-ই ছিল। মুসলমানদের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ হলেও চাকরি ছিল ২ শতাংশেরও কম। তবে একেবারে শেষের দিকে এসে তারা মুসলমানদের জন্য ১০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। সেই অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেস আমলে মুসলমানদের চাকরির অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে, যদিও জনসংখ্যার তুলনায় তা সামান্যই।

কংগ্রেস এবং সিপিএমের সুদীর্ঘ শাসন আমলে পশ্চিমবঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুসলমানরা স্বাধীন ভারতে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে যথেষ্ট পিছিয়ে গেছেন। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও মুসলমানদের কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি কোথাও নেই। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সঙ্গীত, নাটক, সাহিত্য- সব ক্ষেত্রেই প্রায় একই অবস্থা। এসব দেখে মনে হয় না যে, পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ মুসলমান। খুব সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক নীতি ছাড়া এটা কিছুতেই সম্ভব হতো না। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, সাম্প্রদায়িকতার অর্থ শুধু দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধানো নয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য সৃষ্টি করা এবং তা কমিয়ে না এনে রক্ষা করা বা বাড়িয়ে তোলা হল সাম্প্রদায়িকতার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিএমের শাসনের সঙ্গে এদিক দিয়ে কংগ্রেস শাসনের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্যই নির্দেশ করা যাবে না। কমিউনিস্ট পার্টি সাম্প্রদায়িক এ কথা বললে বা শুনলে সাধারণভাবে মানুষের আঁতকে ওঠার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি সিপিএম সরকার যে আচরণ করেছে তাকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিলে সত্যের কোনো অপলাপ হয় না। তবে এ প্রসঙ্গে এটা অবশ্যই জোরের সঙ্গে বলা দরকার যে, সিপিআই বা সিপিএম কোনো সময়ে তাদের কথাবার্তা বা প্রচার-প্রচারণায় সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার করেনি। তারা অসাম্প্রদায়িকতাই প্রচার করেছে এবং পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি হতে দেয়নি এবং কোনো জায়গায় সে পরিস্থিতির সম্ভাবনা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তার মোকাবেলা করেছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ধর্মবিযুক্ত নীতি গ্রহণ না করে তার বিপরীত পথ ধরে অগ্রসর হলে যা হয় তাই হয়েছে। সিপিএমের দীর্ঘ শাসন পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রতিরোধ শক্তির জন্মদান করতে পারেনি যাতে সাম্প্রদায়িতার প্রকাশ্য প্রচার ও তার পরিণতিতে হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঠেকিয়ে রাখা যায়। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গে এখন সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ বিজেপির হাত ধরে ঘটে চলেছে। যেভাবে আরএসএস মার্কা হিন্দুত্ববাদী প্রচার পশ্চিমবঙ্গে চলছে, তাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শর্ত সেখানে বেশ ভালোভাবে ও দ্রুতই তৈরি হচ্ছে, যা মোকাবেলা করার ক্ষমতা সিপিএমের নেই।

পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা অন্যদের তুলনায় ভালো। আগে যে মুসলমানরা কংগ্রেস ও সিপিএমকে ভোট দিত, তারা বিগত দুই নির্বাচনে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। বিপদের মুখে পড়ে খড়কুটো ধরার মতো অবস্থাতেই তারা এটা করেছে। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এখন পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে পুলিশ ও তাদের ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী দিয়ে এক ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে তাতে তাদের জনপ্রিয়তা আর আগের মতো নেই। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকার মুখে সিপিএম বা বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ছে না। সেটা বিপজ্জনকভাবে ঘটছে বিজেপির ক্ষেত্রে। সাংগঠনিকভাবে তারা এখনও পশ্চিমবঙ্গে খুব দুর্বল, কিন্তু হিন্দুত্ববাদের প্রচার সেখানে জোরকদমে চলছে। হিন্দুত্ববাদের জনপ্রিয়তা অর্থাৎ চরম সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেয়ার মতো শর্ত পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে একদিকে যেমন সিপিএম ও বামফ্রন্টের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই, তেমনি জয়ের সম্ভাবনা নেই বিজেপিরও। তবে তাদের ভোট যে বৃদ্ধি পাবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পরিণতিতে তারও পরবর্তী নির্বাচনে কোনোরকমে কাজ চলার মতো সংগঠন দাঁড় করিয়ে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় যদি বিজেপি সরকার গঠন করে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিশেষত এ কারণেও এটা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে যে, ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে নির্বাচনের মাধ্যমে হঠিয়ে দেয়ার ক্ষমতা যে কংগ্রেসসহ কোনো সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল বা তাদের জোটের আছে, এমন কোনো লক্ষণও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নেই।

৩০.০৯.২০১৭

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

 

আয়করে নজর দেওয়া উচিত ছিল, ভ্যাটে নয়
                                  

নতুন বাজেটের আকার আগের মূল বাজেটের চেয়ে ১৭ শতাংশ বড়। এটা সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশ উচ্চাভিলাষী আকার। তবে সবকিছু নির্ভর করবে বাজেট কতটুকু বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর। আমরা বাস্তবায়ন পর্যায়ে বরাবরই একটা দুর্বলতা লক্ষ করে আসছি।

নতুন বাজেটের বড় অংশ চলে যাবে অনুন্নয়ন ব্যয়, তথা সরকারি বেতন–ভাতা ও অন্যান্য খাতে। উন্নয়ন বাজেটে অবকাঠামো খাতে আরেকটু বেশি বরাদ্দ থাকলে ভালো হতো। এ খাতে মোট উৎপাদনের অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।

ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরতা বিগত বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমে কমে এসেছিল। এবার যেহেতু বাজেটের আকার অনেক বড় করা হয়েছে, তাই দেখছি বিদেশি উৎসের ওপর আগের চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এটা কত দূর কী হবে বলা মুশকিল। বিদেশি সহায়তা যেহেতু প্রকল্পের জন্য আসে, তাই বাস্তবায়ন না করতে পারলে ফেরত যায়। অতীতে দেখা গেছে, অনেক বিদেশি অর্থ ফেরত গেছে। শর্ত অনুযায়ী আমরা খরচ করতে পারিনি, কারণ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে আরও জোর দিতে হবে।

তিন–চার বছর ধরে বিদেশি সংস্থা, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমাদের শীতল সম্পর্ক ছিল। তা কিন্তু এখন ভালো অবস্থায় আছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এখন বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে চাইছে। জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাইকা যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগে অনেক আগ্রহী। ফলে বিদেশি সহায়তা আমরা আগের চেয়ে বেশি আশা করতে পারি।

নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন নিয়ে আমরা হতাশ। কারণ, আমরা বলেছিলাম ভ্যাটের হার কমপক্ষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। কিন্তু সেটা করা হয়নি, ১৫ শতাংশই রাখা হয়েছে। এতে দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়বে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আঘাতপ্রাপ্ত হবেন। এখনো যেহেতু সময় আছে, আমি আশা করব এটি পুনর্বিবেচনা করা হবে।

রাজস্ব আহরণে নজর দেওয়া উচিত ছিল আয়করের ওপর। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভ্যাটের ওপর ভরসা করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, মূল্যস্ফীতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা পরে দেখা যাবে। আমরা সব সময় বলে আসছি, আয়করের আওতা বাড়াতে হবে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে না পারায় পরোক্ষ করের ওপর চাপ বাড়ছে। এটা কাম্য নয়। আমি আশা করব, সরকার এখান থেকে সরে এসে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেবে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেটের আগে করপোরেট কর হার কমানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা কমাননি। করপোরেট কর হার বাংলাদেশে বেশি। আমরা আশা করেছিলাম, এটা কমবে। আমরা আবার বলতে চাই, এটা কমানো হোক। এটা যেন পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ও অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ করা হয়।

তৈরি পোশাক খাতের ওপর উৎসে কর আরোপের কোনো সুযোগই নেই। ১০-১৫ বছর ধরে এ খাতে আমরা যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছিলাম তা কিন্তু শ্লথ হয়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়। প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি না হলে আমরা কিন্তু পোশাক খাতে ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারব না। আমাদের রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমরা পারছি না। নতুন করে উৎসে কর বাড়ালে সমগ্র রপ্তানি খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এখানে আরেকটা বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে যে, প্রতিযোগী অনেক দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। বিপরীতে টাকার মূল্য আমরা ধরে রেখেছি। এতেও রপ্তানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমি মনে করি, টাকার অবমূল্যায়ন দরকার।

ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের ওপর যে আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা দেখেছি, বেসরকারি ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের ফি, মাশুল কেটে রাখে। অনেক গোপন মাশুলও। এসবের আঘাতে গ্রাহকেরা জর্জরিত। তারপর এখন আবার আবগারি শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষের প্রতি কী ধরনের বিচার হলো, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।

 
প্রবৃদ্ধির আত্মতুষ্টি অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে
                                  

মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাগুজে অর্জনের আত্মতুষ্টি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে। এরই মধ্যে তিন ধরনের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে অর্থনীতির জন্য। ঘোষিত বাজেট দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রবৃদ্ধির একধরনের কাগুজে অর্জনের আত্মতুষ্টিতে ভুগছে দেশের বর্তমান নীতিনির্ধারক মহল। এ বাজেটে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

ঘোষিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির জন্য যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ—সব কটির প্রবৃদ্ধির ধারা স্থবির অথবা নেতিবাচক। সেখানে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন দেখে মনে হচ্ছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মতো কোনো নীতি-কৌশল এবারের বাজেটে নেই। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাত ও প্রবাসী আয় ছিল প্রবৃদ্ধির বড় চলক। কিন্তু এগুলো এখন স্থবির। প্রবৃদ্ধির স্থবির চলক দিয়ে কীভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব, তার বাস্তবভিত্তিক কোনো কৌশল নেই।

অর্থনীতির জন্য এরই মধ্যে যে তিনটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সেগুলো হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা, বাস্তবায়ন অদক্ষতা ও কর্মসংস্থানের খরা। দুর্নীতি ও ব্যবসার বৈরী পরিবেশের কারণে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন অগ্রগতি থেকে বাস্তবায়নের অদক্ষতার চিত্র পাওয়া যায়। সবশেষে সরকারি হিসাবেই আমরা দেখছি কর্মসংস্থানের হার কমছে। এ সরকারের ২০১০-১৩ ও ২০১৪-১৬ সময়কালের কর্মসংস্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, কর্মসংস্থানের হার আগের চেয়ে কমেছে।

ঘোষিত বাজেটকে উন্নয়ন মহাসড়কের সঙ্গে তুলনা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আমি মনে করি, এ মহাসড়কের তিনটি বিপজ্জনক ও ভয়াবহ খন্দক হচ্ছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অদক্ষতা। সব সময়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির একধরনের টেকসই গতিশীলতা আমরা দেখতে পাই। যেখানে সহজে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে যায় না। আমাদের অর্থনীতির জন্য এখন উত্তরণের সময়। যেখানে সত্যিকারের প্রবৃদ্ধি ঘটবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু সেই উত্তরণটি আসলে হচ্ছে না। এর বড় কারণ, প্রবৃদ্ধির কাগুজে অর্জনের আত্মতুষ্টির অহমিকা পেয়ে বসেছে শাসক গোষ্ঠীকে। এ অহমিকার কারণে প্রতিবছর অবাস্তবভাবে বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছে। যার ফলে গত ২০১৩ সাল থেকে প্রাক্কলিত বাজেট ও প্রকৃত বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখতে পাচ্ছি। প্রবৃদ্ধির আত্মতুষ্টির বড় কুফল হচ্ছে, বাজেটে একধরনের বাহাদুরির আকার দেখানো হচ্ছে। কিন্তু যেখানে হাত দেওয়া দরকার, সেটি করা হচ্ছে না।

বিনিয়োগ, বাস্তবায়ন অদক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকার বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষ কোনো নীতি-কৌশল দেখাতে পারছেন না। একধরনের দুষ্ট চক্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবাস্তব প্রবৃদ্ধির কাগুজে আত্মতুষ্টির জন্য বড় বাজেট, বড় প্রকল্পমুখী হয়ে গেছে শাসক দল। যার কারণে অর্থের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা হচ্ছে প্রতিবছর। যার জন্য ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের অনৈতিক প্রস্তাব এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাটের হার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণের ওপর।

আমি মনে করি, প্রবৃদ্ধির কাগুজে অর্জনের অহমিকা সার্বিকভাবে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে যেখানে হাত দেওয়া খুব জরুরি, সেখানে হাত দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের সংস্কারে কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংক খাতে সব সময়ই সব দেশেই কিছু চুরি হয়। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যও চরম অনৈতিক এক বক্তব্য। ব্যাংক খাতে শুধু চুরি না, সাগরচুরি হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের ব্যাংক থেকেই এ সাগরচুরির ঘটনা ঘটছে। সরকার এ চুরির ক্ষেত্রে একধরনের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। আইন সংশোধন করে বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিবারতন্ত্র নিশ্চিত করা হচ্ছে। সেটা চুরির পথকে আরও সুগম করবে। আর সরকারি ব্যাংকের লুটেরাদের আইনের আওতায় না এনে আবারও করের টাকায় মূলধন জোগানের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবারের বাজেটেও।

মেগা প্রকল্পের নামে মেগা খরচের পথ তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্প খরচকে অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এসবের ওপর কোনো নজরদারি নেই। অবকাঠামো নিয়ে শাসকগোষ্ঠী রীতিমতো বড়াই করছে। অথচ বড় অবকাঠামোর সুফল নিশ্চিত করতে যে ধরনের সুশাসন দরকার, তার ছিটেফোঁটাও নেই। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হানিফ ফ্লাইওভার। বিপুল অর্থ খরচ করে ওপরে একটা বড় অবকাঠামো তৈরি করা হলেও অথচ ফ্লাইওভারটির নিচের রাস্তাটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সার্বিকভাবে বললে অর্থনৈতিক সুশাসনের বড় ঘাটতি রয়েছে।

প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক আত্মতুষ্টির কারণে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্যের হার—এসব পরিসংখ্যানের মধ্যে রাজনীতি ঢুকে যাবে। এরই মধ্যে প্রবৃদ্ধির হারের মধ্যে একধরনের রাজনীতি ঢুকে গেছে। বাধ্য হয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, নিম্ন দারিদ্র্য ও নিম্ন মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান দেখাবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু ভাতা বাড়ানো হয়েছে। খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নগদ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে। তবে আমি মনে করি, প্রাথমিক বৃত্তির টাকার অঙ্কের পরিমাণটি বাড়ানো দরকার। ২০০৪ সালে এ বৃত্তির পরিমাণ ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এখনো তা-ই রয়ে গেছে।

 

 
দুধ কলায় বিষধর সাপ পুষেছে সরকার, রাস্তায় গাল দেয় ইমরান সরকার!
                                  

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন চলাকালে আওয়ামী লীগ দলীয় মহিলা এমপিদের একাংশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন ইমরান এইচ সরকারকে শায়েস্তা বা প্রতিরোধ করার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকে প্রশ্রয় দেননি, নিভৃত করেছেন। তবে দুঃখ ও আফসোসের সঙ্গে বলেছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজত তাণ্ডবের সময় কোথায় ছিল ইমরান?  

তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ইমরান আজকে নেতা। সে এখন বড় বড় কথা বলে। এর আগে ছাত্রলীগ নেতারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকে কুত্তার মতো পেটানোর হবে।


তারা আরো ঘোষণা দেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যেখানে ইমরান এইচ সরকার ও সনাতনকে (সংস্কৃতিকর্মী) যেখানেই দেখা হবে, সেখানে কুত্তার মতো পেটানো হবে।

যদিও আইন হাতে তুলে নেয়ার এখতিয়ার কারো নেই এবং সমর্থনযোগ্য নয়। সেকারণে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের আবেগমথিত এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের মহিলা এমপিদের প্রশ্রয় না দিয়ে উল্টো নিভৃত করে অভিভাবকত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

ইমরান এইচ সরকারকে কেউ জানতো না, কেউ চিনতোও না। কিন্তু এ কবছরে ইমরান এইচ সরকার আজ শাসকদলকেই ঝাঁকুনি দিচ্ছেন না; একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও দণ্ডিতদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনই গড়ে তোলেননি; দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হয়েছেন। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে গঠিত ট্রাইবুন্যাল যখন জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবতজীবন দণ্ডে দণ্ডিত করেছিল তখন প্রতিবাদী তারুণ্য শাহবাগে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। সরকারের সঙ্গে জামায়াতের গোপন আঁতাতের ফসল যাবতজীবন কারাদণ্ড, এই আশংকায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তারুণ্যের সঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছিল। নারী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিবাদের গণজোয়ার তৈরি করেছিলেন জনতা। সকল প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন সেই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিলেও সেদিন মঞ্চে তাদের নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন এককালের চীনাপন্থিরা। এমনকি গণদাবির মুখে আইন সংশোধন করে উচ্চ আদালতে আপিলের ব্যবস্থা করে কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা হয়।

ইমরান এইচ সরকারসেইদিন গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারকে আওয়ামী লীগ সরকার আশ্রয়, প্রশ্রয়, প্রক্টেশনই দেয়নি, তার নির্দেশে শিক্ষাঙ্গনে জাতীয় পতাকা উঠেছিল। সেদিনও বলেছিলাম, শাহবাগের বিপ্লবকে অভিনন্দন জানাই। তারুণ্যের প্রতিবাদকে অভিনন্দিত করি; কিন্তু শাহবাগের এই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে না। গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান সরকারের ডাকে সারাদেশের মানুষের পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রীরা পর্যন্ত সচিবালয় থেকে বেরিয়ে এসে সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছিলেন। জনগণ সরকার কিংবা আদালতের প্রতি যেকোনো দাবি জানাতেই পারে। কিন্তু মন্ত্রীরা, আমলারা যখন রাস্তায় নেমে ইমরান সরকারের ডাকে সংহতি জানান; তখন আমরা বলেছি আদালতের ওপর এর প্রভাব পরে। এটা যুক্তিসংঘত নয়। সেদিন গণজাগরণ মঞ্চের অতি বিপ্লবীরা স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মুজিব বাহিনীর অন্যতম ৪ প্রধানের একজন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুন্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদের প্রতিও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিলেন। ছাত্রলীগ সেদিন থেকেই প্রতিবাদ করতে গিয়ে দূরত্ব তৈরি করেছিল।



পরবর্তীতে দিনে দিনে মতলববাজী যত দৃশ্যমান হতে থাকলো, ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বাধীন গণজাগরণ মঞ্চে ভাঙনই দেয়া দেয়নি; রীতিমতো দুর্বল হয়ে পড়ে। বুড়িগঙ্গার জল অনেক দূষিত হয়েছে। সময়ের চাকা নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে। রংপুর মেডিকেল থেকে পাস করে আসা ইমরান এইচ সরকার পেশাগত জীবনে সাফল্য হাতের মুঠোয় পুরতে পারুন আর নাই পারুন; দেশবাসীর সামনে একনামে পরিচিত হয়ে গেছেন। তার আয় রোজগারের ব্যবস্থা কি? তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তার সুরাহা হোক বা না হোক, ইমরান এইচ সরকার, সরকারি বাসভবনে জামাই আদরে উঠে যাবার সুযোগ পেয়েছেন। এককালের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে হিজরত করে এসে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এমপিই নন, শিক্ষামন্ত্রীই নন; প্রেসিডিয়ামেই ঠাঁই পেয়েছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ।

একে একে যুদ্ধাপরাধীদের গলায় ফাঁসির রশি ঝুলেছে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ কন্যা ভালোবাসার টানে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকারের গলায় বরমাল্য দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদের রক্তচাপ মাপার মতো ডাক্তারি পরীক্ষার ছবিখানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হয়েছে বিয়ের আনন্দঘন দম্পত্তির ছবিগুলোও। শিক্ষামন্ত্রী শ্বশুরের মিন্টোরোডের সরকারি বাড়িতে থেকে খেয়ে হেফাজতে ইসলামসহ আলেম ওলামাদের দাবির প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের মানচিত্র ঢেকে দিয়ে বসানো বহুল বির্তকিত মৃণাল হকের গ্রীক দেবী থেমিসের বিকৃত ভাস্কর্য সরানোর প্রতিবাদে ইমরান এইচ সরকার তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়ে সুপ্রিম কোর্ট এলাকা পর্যন্ত মশাল হাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। সেই মিছিল থেকে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে, ছি ছি হাসিনা, লজ্জায় বাঁচি না।

এমন সব অসভ্য স্লোগানে নগরবাসী আলোড়িত না হলেও একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আত্না শান্তি পেয়েছে কিনা জানিনা, তবে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী ও সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতারা তৃপ্তির হাসি হেসেছেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নিজের ক্যারিশমায় গণসমর্থন নিয়ে ওয়ান ইলেভের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্যালট বিপ্লবে অভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতায় না আসলে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলা দূরে থাক; আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হতো না। শেখ হাসিনা সরকারকে না থাকলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইমরান এইচ সরকার বা গণজাগরণ মঞ্চের জন্মও হতো না। বিএনপি জামায়াত শাসনামলে যখন গ্রেনেড, বোমায়, জঙ্গিবাদের আক্রমণে গোটা বাংলাদেশ রক্তাক্ত যখন ইমরান এইচ সরকার বা তার গণজাগরণ মঞ্চের আবির্ভাব ঘটেনি। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মশাল প্রজ্জলিত হতে দেখা যায়নি। সরকারের সমর্থনে, সরকারি দলের খেয়ে পরে গণজাগরণ মঞ্চ ও ইমরান এই সরকারের আর্বিভাব এবং টিকে থাকা জড়িয়ে আছে।

একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক বন্ধুবরেষু মোজাম্মেল বাবুর আমন্ত্রণে দুবছর আগে থার্টি ফার্স্ট নাইটে আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম। অকাল প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল সেই আড্ডায় ছিলেন। আমার টেবিলে একাত্তরের মানবতা বিরোধী ট্রাইবুন্যালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ও ইমরান এইচ সরকার যখন এসে বসলেন তখন মাহবুবুল হক শাকিল এসে ইমরানকে বলেছিলেন, গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম ব্যানার থেকে আন্দোলনের টাকাটা আমি দিয়েছিলাম, আজ তুই কোথা থেকে কার টাকায় রিষ্ট-পু্ষ্ট হচ্ছিস; সব খবর রাখি। আমার টেবিলে বসা ইমরান এইচ সরকারকে চরমভাবে অপমান-অপদস্ত করায় আমার খারাপ লাগছিলো। একজন মানুষকে এভাবে অপদস্ত করা মানে আমাদেরকে অসম্মানিত করা, এই বিবেচনাবোধ থেকে অনুজপ্রতীম, স্নেহভাজন শাকিলের আচরণের প্রতিবাদ করেছিলেন। সে রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাক্ষী অনেক সংবাদ কর্মীই রয়েছেন। পরদিন ভোরে টেলিফোন করে শাকিল আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে আবেগ আপ্লুত হয়েছিলেন। তারপর শাকিলের সঙ্গে অনেক দেখা সাক্ষাত, আড্ডা হয়েছে। আজকে শাকিল বেঁচে থাকলে কি প্রতিক্রিয়া হতো, তা জানি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, ইমরান এইচ সরকারকে বা তার গতিপ্রকৃতিকে শাকিল আয়ত্ব করেছিলেন। করেছিলেন বলেই, এতটা বিক্ষুদ্ধ ও চড়াও হয়েছিলেন।

আজকে শাসকদল আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়ায় এবং ইমরান এইচ সরকারের তৎপরতায় এটাই দৃশ্যমান হচ্ছে যে, সরকার সেদিন দুধ কলা দিয়ে একটি বিষধর সাপ পুষে ছিল। যে সাপের দংশনের বিষ এখন সরকারকেই হজম করতে হচ্ছে। সরকারের ভেতরে বাস করা জনবিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে যাদের অতীত অতি বিপ্লবের, ব্যর্থতা আর কলংকের বোঝা বহন করা। তারা শেখ হাসিনার সরকার দিয়ে তাদের রাজনীতিটা বা মিশনটা পূরণ করে নিতে চান। আর শেখ হাসিনা ও তার সরকার গণতান্ত্রিক রাজনীতির নানা পথে দাবা খেলায় জিততে চান। এখানে ওই শক্তিটি সরকারকে উগ্র, হটকারী পথে টানতে চায়। সেখানে সাপের খেলায় ইমরান এইচ সরকার তাদের হয়ে কাজ করছেন কিনা, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

পীর হাবিবুর রহমান।।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ভেঙে গেল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিকের স্বপ্ন!
                                  

তাহলে শঙ্কাই সত্যি হলো। প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হচ্ছে না আপাতত। এমন যে ঘটতে পারে সে কথা বিজ্ঞজনেরা আগেই বলেছিলেন। সন্দিহান ছিলেন সরকারের ঘুঁটিচালা কেরানি, ঠিকাদার আর সুবিধাভোগীদের কূটচাল নিয়ে। তাঁরা প্রজেক্ট আর ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত। ভুল পথে মহৎ উদ্দেশ্যও সফল হয় না। বিজ্ঞজনদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার স্তর কত দূর পর্যন্ত হবে, সে তর্ক শেষ হয়নি। পাকিস্তান আমলে এটা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। পঞ্চাশের দশকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়। তখন থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে তোলার সুপারিশ এসেছে। ১৯৫৯ সালের শরিফ কমিশন পরবর্তী ১৫ বছরে, অর্থাৎ সত্তর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ পাকিস্তানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার সুপারিশ করেছিল। ছাত্র গণ-আন্দোলনে শরিফ কমিশন বাতিল হয়ে যায়। ১৯৭০ সালের নূর খান কমিশন তো আলোর মুখই দেখেনি। ১৯৭৪ সালে কুদরত-এ-খুদা কমিশন ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টমে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে সে স্বপ্নও হিমাগারে যায়।
তারপর হরেক শিক্ষা কমিশন হয়েছে; কিন্তু সেসব কমিশনের সুপারিশ বিরোধিতার মুখে পড়ে, কিংবা ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে মৃত ঘোষিত হয়। সেদিক থেকে ২০১০ সালের কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশনকে ভাগ্যবান বলতে হবে। এ কমিশন তেমন বিরোধিতার মুখে পড়েনি। আর এ সময়ের মধ্যে সরকারও বদলায়নি। সত্যি কথা বলতে কি, এই প্রথম কোনো শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে একই সরকার সাত বছর সময় পেল এবং হয়তো আরও বছরখানেক পাবে। এই সাত বছরে শিক্ষামন্ত্রীও আছেন একজনই। প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ২০১৮ সাল নাগাদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। সে হিসাবে হাতে এক বছর সময়ও নেই। কিন্তু সরকার অন্তত এ সত্যটা মেনে নিয়েছে যে এ রকম পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের প্রস্তুতি নেই।
কত বছরের প্রাথমিক শিক্ষা যথাযথ, তা নিয়ে পৃথিবীতে মতভেদ আছে। ভারতে তা অনেক আগে থেকেই আট বছর মেয়াদি। অস্ট্রেলিয়ায়ও আট বছর। কিন্তু চীনে ছয় বছর। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মিসর, জাপানেও তা–ই। ওদিকে পাকিস্তানে এখনো আমাদের মতোই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। আলজেরিয়া, ব্রাজিল, ফিনল্যান্ড, রাশিয়া, সুইডেনে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর নবম শ্রেণি পর্যন্ত। এশীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আমরা তেমন খারাপ অবস্থায় হয়তো নেই।
কিন্তু যদি ব্যাপারটা এমন হয় যে অষ্টম শ্রেণির পাঠ সমাপনীকে আমরা নিম্ন-মাধ্যমিক না বলে এখন থেকে প্রাথমিক বলতে চাই, তাহলে কিন্তু কোনো সমস্যা নেই। শুধু সরকার একটা ঘোষণা দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কেননা, আমাদের দেশে সত্যি সত্যি প্রাথমিক থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শুধু কেতাব ছাড়া আর কোনো পার্থক্য কখনো চিহ্নিত করা হয়নি।
বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহু বিচিত্র ধরনের। কোথাও নার্সারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক, কোথাও তৃতীয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক, কোথাও ষষ্ঠ থেকে ব্যাচেলর আবার কোথাও উচ্চমাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ানো হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (যার যার মতো) অনুমোদন দিয়ে নিজেদের সার্থক মনে করে। কাজেই কোথায় পড়ানো হয়, কে পড়ান, কী পড়ান—এসবই বাংলাদেশে অবান্তর প্রশ্ন।
তবে একটা ব্যবস্থা বেশ জবরদস্ত। প্রথম থেকে পঞ্চম প্রাথমিক, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম পর্যন্ত জুনিয়র, নবম-দশম মাধ্যমিক, একাদশ-দ্বাদশে উচ্চমাধ্যমিকের তকমা লাগানো আছে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত তাবৎ বই রচনা, প্রকাশ ও বিনা মূল্যে বিতরণ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সট বুক বোর্ড (এনসিটিবি)। একাদশ-দ্বাদশের বই অনুমোদন দেয় এনসিটিবি। প্রাথমিকের পাঠদানের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক (হালে তা স্নাতক)-সহ সি-ইন-এড, মাধ্যমিক শিক্ষকের ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতকসহ বিএড আর উচ্চমাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি (কোনো প্রশিক্ষণ আবশ্যকীয় শর্ত নয়)। কাজেই প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর, পাঁচ বছর বা দশ মেয়াদি কি না, এ প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর যতক্ষণ না আমরা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সংজ্ঞা নির্ণয় করতে পারি। সে চেষ্টা এ বঙ্গে কখনো হয়েছে বলে শুনিনি। তবে কিছু শিক্ষাবিদ প্রশ্নটা তুলেছিলেন; কিন্তু কেরানিশাসিত বাংলায় কেরানিরা যা বুঝেছেন, বলেছেন জাতির কাঁধে তা-ই চাপানো হয়েছে।
স্বপ্ন তাঁরা যতই দেখান, শিক্ষায় হাড়কিপ্টেমিতে কেউ কারও চেয়ে কম যান না। এ খাতে বরাদ্দ কমাতে কমাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নামিয়ে আনা হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশে। এই বরাদ্দ নেপাল, ভুটানের চেয়েও কম। কাজেই যে বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রয়োজন ছিল, তার কিছুই করা হয়নি। অথচ শুধু সদিচ্ছা থাকলেই, অপচয় আর ব্যাংক খাতের লুটপাট রোধ করতে পারলেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব।
আমরা কাজের চেয়ে অকাজে ওস্তাদ। বিরোধিতাহীন এক শিক্ষানীতি পাস করাতে পেরে তাই সবজান্তারা আসল কাজে হাত না দিয়ে প্রাথমিক সমাপনী আর জুনিয়র পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেশব্যাপী প্রতিবাদ, মানববন্ধন, আদালতে মোকদ্দমা ঠুকেও তা থেকে শিশু-কিশোরদের মুক্তি জুটল না। দেশে কোচিং বাণিজ্যের বন্যা বইল। অবুঝ শিশুরা গিনিপিগ হয়ে মনোবৈকল্যের শিকার হচ্ছে, গোটা জাতি পঙ্গু হতে চলেছে।
শিক্ষার স্তর শুধু গেজেট প্রকাশ করা নয়; বরং মেধা, বয়স, রুচি, সামর্থ্য, জাতীয় চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা ও মানবিকতার বিকাশ, নৈতিক ও নিষ্ঠার অনুশীলন, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা। সেটা যদি তারা বুঝত, তাহলে আগে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, গবেষকের সমন্বয়ে তারা ঠিক করত জাতীয় লক্ষ্য ও চাহিদাগুলো। কিন্তু এ দেশে তাবৎ কমিটি/কমিশন পদাধিকারীদের ক্লাব। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন দলীয় তকমাধারীরা। সেখানে ভিন্নমতের স্থান নেই। আর সেখানে চলে অবাধ লুটপাটের রাজত্ব।
গত কয়েক বছরে শিক্ষার এই দুর্দশা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, টক শো হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সরকারের ঘনিষ্ঠজনেরা কারও কথা গায়ে মাখেননি।
বহু ঢাকঢোল পেটানো জাতীয় শিক্ষানীতির বুনিয়াদ ধসে পড়েছে; শিক্ষার গোটা তাসের ঘর মাটিতে মিশে যেতে কতক্ষণ!
আমিরুল আলম খান: সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড।

কাফেলার অদৃশ্য সালার -তালিম হোসেন
                                  

জীবন থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ছে সে,
মরণর পরে চিরঞ্জীব হয়েছে আমাদের জন্যে
ইথারে ইথারে আজো তাঁর কমান্ড ভেসে আসছে,
আজো এই কাফেলার অদৃশ্য সালার
মহান শহীদ জিয়াউর রহমান।

দ্যাখো কী আশ্চর্য।
ঢাকার ষ্টেডিয়াম আর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে,
রাজধানীর পথে পথে আর শেরে বাংলা নগরের বিস্তীর্ণ চত্বরে
কাছে দূরের শহরে বন্দরে আর
গ্রামে গঞ্জে, প্রান্তরে নদীতে
লক্ষ কোটি মানুষের চোখে
শোকের পবিত্র আগুন,
ভালোবাসার চিন্ময় ফুল
আর সংকল্পের উদ্যত বজ্র
দেশ রক্ষা বাহিনীর সৈনাপত্য ছেড়ে দিয়ে
দেশের এক বীরোত্তম সন্তান খালি হাতে নেমে এলো
দেশের নয় কোটি দু:খী ভাই-বোনের কাতারে,
ফুঁকে দিল উচাটন মন্ত্র
প্রাণে প্রাণে জ্বালিয়ে দিল দাবানল।

শত্রু কি জানেনি আগে কি তার দাহিকা!
তার মুর্খতা নেভাতে চেয়েছিল তা
ব্রাশফায়ারের এক ঝলক ফুৎকারে!

তার কফিনে ঢাকা প্রিয় মুখ আমরা দেখিনি,
শত্রু সেখানে প্রাণ রক্তের যে উৎস মুখ খুলে দিয়েছিলো,
জানিনা তা দয়ে সেখানেও আঁকা হয়েছিল কিনা
তার সেই রহস্যময় হাসির আভাস।

যাদুর ঝাঁপি খুলে দিয়ে
অনবসরের যাদুকর
ঘুমাতে গেল মাটির শীতল বুকে।

তারপরই উন্মোচিত হলো আসল নাটক।
সেতো, উপরে নেই, নীচে নেই,
কাছে নেই, দূরে নেই কোথাও নেই আজ।
অথচ সে ছিলো জীবনের সর্বত্র।

মরণের দুয়ারগুলো চারদিকে খোলা রেখেই
জীবনের মাঠ চষে বেড়িয়েছে সে,
সঙ্গে নিয়েছে সারাদেশের মানুষকে।

দিনগুলো হয়েছে তার অবিশ্রাম কর্মশালা,
রাতগুলো হয়েছে দিনের ব্যস্ত দৌবারিক।
তার পায়ের নীচে মসৃণ কার্পেট আর কঠিন মাটি
নিজেদের অস্তিত্ব বিনিময় করেছে
তাকে পাওয়া যাবে মাঠের মাঝে, খালের পাড়ে,
গ্রামে-গঞ্জে-চাঁদোয়ার তলে, খোলা আকাশের নীচে।
পকা রাস্তায় ধূলি-কাদার পথে, নবজীবনের পথে।
সেনানিবাস আর সার্কিজ হাউজ,
রাজপুরুষদের বৈঠক, কর্মী-সভা আর সুধী-সামাবেশ,
কল কারখানা, কৃষকের খামার আর
কুটির শিল্পের আঙিনা,
রাষ্ট্রীয় সফর, গানের জলসা আর প্রমোদ বিহার
সে আছে সর্বত্র কিন্তু বাধা নেই কোথাও।

সকল প্রাণকে বিদ্যুতায়িত করে
বিদ্যুৎ-গতি হয়েছে তার সার্বিক অভিযান।
দেশের সব হৃদয়কে দেশপ্রেমের
এক সুতোয় গাঁথতে চেয়েছে সে,
সংশয় আর সন্দেহের প্রাচীর বন্ধ
সকল দল গোষ্ঠী সম্প্রদায় আর
জাতী-উপজাতির বিচ্ছিন্ন দ্বীপকে মেলাতে হবে,
মেলাতে হবে এক দেশাত্মক জমাট শিলার
সংহত সত্তায়।
কোন সহজিয়া ব্রতের অঙ্গীকার নয়, তা জেনেই
সে অগ্রসর হয়েছে, কণ্ঠে নিয়েছে গান-
“জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ”
মৃত্যু কি তাকে বাংলাদেশের
আত্মার ফলক থেকে মুছে নিতে পারে।

সৈনিকের শিরস্ত্রাণ আছে,
আর্থ-সামাজিক ধ্যান দারণার ধর্ম আছে,
তা সত্ত্বেও নিত্য-সংগী তসবহি আর জায়নামাজ।
অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে।

“আল্লাহর উপরে পূর্ণ ঈমান” রেখে।
সত্যের জয় হবে-
তালপট্টি আমাদেরই হবে
সব প্রতিবেশী বন্ধু হবে,
সততার আলোয় উদ্ভাসিত হবে কাফেলার মুখ
ঈমানের আগুনের বজ্রের তেজ আসবে
নয় কোটি হাতের হাতিয়ারে,
জাগ্রত নারী পুরুষের ক্লান্তিহীন সংগ্রামে
ফসলের মাঠ, মাটি আর পানি রত্নগর্ভাহবে,
সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের উষাবিকাশ হবে
বাংলাদেশের সুপ্তোসিত লোকালয়ে
সবুজ প্রান্তরে সুনীল আকাশে।

চট্টগ্রামের এক নিষ্ঠুর রাতের অলিন্দে
নির্জন এক রাত জাগা পাখী তার প্রিয়ার কাছে
আমাদের জন্য বানী পাঠিয়েছিল
“কাল সাকালে ঢাকায় আসছি”।

তার কাল সকাল আর এই আশ্বাসে
আমরা বিশ্বাস রেখেছি-
সে আসবেই থাকবে আমদের সংগে
যেমন করে সেই চট্টগ্রাম থেকেই আর একদিন
রাতের দুঃসহ অন্ধকার সহসা সচকিত করে
সে আমাদের জন্যে পাঠিয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের বজ্রবাণী;
ভেসে এসেছিল একটি একক কণ্ঠের ঘোষণা:
আমি জিয়া বলছি,
তবু আমরা বিশ্বাস করেছি এবং
সে বিশ্বাস সার্থক হয়েছে-
স্বাধীনতার এক অরুণ প্রভাতের উজ্জ্বল মহিমায়
সে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে
এবারও চট্টগ্রামের মাটি তাকে চির অন্ধকারে
ঢেকে ফেলার গ্লানি বহন করেনি,
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়-
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে
হয়েছে তার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।

সংশয়ের মেঘ ঢাকা আকাশে
বিশ্বাস আর আর্তিক ভালবাসা আর শোকের
পথিক আলোক ঢল নেমেছে
তার কাল সকাল-এর সেই নিভৃত বাণী
উদ্ভাসিত হয়েছে অনাগত বহু সকালের
আলোকিত আশ্বাসে।
শিরায় শিরায় রক্তের যেমন চলাফেরা-
আমাদের ভাবনার অন্তরে আর
দেশের জীবৎ অস্তিত্ব জুড়ে
এক মাহান শহীদের স্মৃতির তেমনি প্রাণবন্ত বিচরণ।

বহুবার শোনা সেই আপ্ত-বাক্য সে আমাদের
আবার নতুন করে শুনিয়ে দিয়ে গেল-
“আল্লাহর রাস্তায় যে প্রাণ দিয়েছে।
তাকে মৃত বলো না সে অমর।”

জামায়াতকে নিয়ে কী করবে বিএনপি?
                                  

গেল রবিবার  নিয়মিত লেখাটি ঢাকায় না থাকার কারণে দিতে পারিনি বলে প্রকাশিত হয়নি। ভেবেছিলাম গ্রামের বাড়ি থেকে লিখে পাঠাব। এর আগে দু-একবার স্ক্যানিং করে পাঠিয়েছি। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় সেই যে বিদ্যুৎ গেল আর দেখা নেই কয়েক ঘণ্টা। এলো একেবারে ভোরে। এত নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, তো সে বিদ্যুৎ গেল কোথায়? বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে বিশাল ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে, তাতে বোঝা গেল চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশিই হচ্ছে। যদি তাই হবে, জ্যৈষ্ঠের দুঃসহ গরমে ব্যাপক লোডশেডিংয়ে গোটা দেশ হাঁসফাঁস করবে কেন? খবর নিয়ে জানলাম শুধু আমাদের গ্রামেই নয়, আশপাশের সব গ্রামেই একই অবস্থা। বাস্তবতা হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫-৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না। মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় বিভিন্ন বিদ্যুৎ অফিসে হামলা করছে। পল্লী এলাকায় আসলে বিদ্যুৎ সরবরাহই কম। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। রবিবার দুপুরে ঢাকায় ফিরে দেখি এখানেও একই অবস্থা। রাজধানীতেও লোডশেডিং বেড়ে গেছে। পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক ঝড়ে ভৈরবে বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। সংরক্ষণ, মেরামতসহ আরও নানা কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে নাকি চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আরও ভয়ের কথা। তারা বলেছেন, বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে ঘাটতি থাকায় এ মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে না। এটা হতে হতে আরও তিন-চার বছর লেগে যাবে। বাংলাদেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। উৎপাদন কিন্তু তত হয় না। পিডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০ মে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৮ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ যা উৎপাদিত হচ্ছে সরকার তার যথাযথ ব্যবস্থাপনাও করতে পারছে না। সরকারপক্ষীয় একজন দলদাস বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে তিনি বললেন, গ্রামে বিদ্যুৎ গেছে কবছর হবে? যখন বিদ্যুৎ ছিল না তখন মানুষ থেকেছে কীভাবে? তখন কুপি, হ্যারিকেন আর হাত পাখায় চলেনি? শুনে থ মেরে গেলাম। বললাম, ভোটের সময় এমন বইলেন, একেবারে বস্তাভরে ভোট দেবে নৌকায়। এর বাইরে আর কোনো জবাব ছিল না আমার। দুঃখিত, গেল সপ্তায় লিখতে না পারার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু জরুরি কথা বলতে গিয়ে বিষয়টা একটু বড়ই হয়ে গেল। বিষয়টা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিধায় পাঠকরা ক্ষমা করবেন আশা করি।

দেশের সর্বত্র এখন নির্বাচন নিয়েই আলোচনা। আলোচনা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে ঘিরে। সরকারের মন্ত্রী, মিনিস্টার এবং লীগ নেতারা ইদানীং সুর কিছুটা নরম করেছেন। এতদিন তো তারা এবং তাদের দলদাস বুদ্ধিজীবীরা মিডিয়া ফাটিয়েছেন এই বলে যে, বিএনপি নামক দলটি অস্তিত্ব সংকটে আছে। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বলে হিসেবেই রাখেনি। কেউ কেউ এমন করুণাবাক্যও উচ্চারণ করেছেন যে, বিএনপি বিরোধী দল হিসেবেও যদি একটা ভূমিকা রাখতে পারত দেশের ও গণতন্ত্রের উপকার হতো। আহ্, সেটাও তারা পারছে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচন তাদের মধ্যে নতুন বোধোদয় ঘটিয়েছে বলে মনে হয়। লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরই প্রথম বললেন, এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, বিএনপিকে খাটো করে দেখা যাবে না। নারায়ণগঞ্জে একমাত্র দলীয় মার্কার জোরে (কোনো কোনো নেতার অসহযোগিতা সত্ত্বেও) অস্থানীয় একেবারে নতুন একজন প্রার্থীর ১ লাখ ভোট প্রাপ্তি এবং কুমিল্লা সিটিতে বিজয় বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর মনোবল অনেক চাঙ্গা করেছে বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগকে মনে হচ্ছে কিছুটা নিষ্প্রভ আর বিএনপিকে মনে হচ্ছে অনেকটা উদ্দীপ্ত। সরকার ও সরকারি দল বিএনপিকে হত্যা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী দল হিসেবে নেতিবাচক একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করে আসছে তা এখন আর ফলপ্রসূ কিছু হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

বিএনপি সাধু সন্যাসীর দল নয়। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নৈরাজ্য সৃষ্টি ইত্যাদিতে তারা যুক্ত ছিল না তা পাগলও বলবে না। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনদের তৃণমূল পর্যন্ত নানা অপকর্মের যে দৃশ্য এখন মানুষ চাক্ষুষ দেখছে, তাতে তাদের মুখে বিএনপির অপকর্মের কাহিনী মানুষ শুনতে বিরক্ত বোধ করছে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেশ খানিকটা এগিয়ে দিয়েছে। মানুষ এখন বিএনপি আমল আর লীগ আমলের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ব্যাংক লুট, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুট, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সব ধরনের বাজিকরির তুলনামূলক বিচার করতে শুরু করেছে। সরকারি দলের নির্মোহ সমর্থক-বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যে আভাসে-ইঙ্গিতে বলতে চাইছেন যে, পয়েন্টে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। শত প্রতিবন্ধকতার মুখেও বিএনপি যদি নির্বাচনী সড়কে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকে তারা লাভবান হবে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। বিএনপি প্রকৃত অর্থেই একটি পেটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল। এ দল নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ভুল করে এখন পস্তাচ্ছে। এখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে সহায়ক সরকারের কথা বলছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাই তো সহায়ক সরকার হতে পারত। এখনো সহায়ক সরকার তো হয় সবাইকে নিয়ে অথবা সবার পছন্দের তেমন একটি সরকারই হবে। আইনগত জটিলতা থাকলে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সময়ে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনকালে গৃহীত ব্যবস্থার মতো একটি ব্যবস্থা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে নেওয়া যেতে পারে, যা পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনে অনুমোদন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবেন সবাই এবং নির্বাচনের পর সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। আর প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যেখানে একটি প্রশ্নবিদ্ধহীন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে বারবার তার আগ্রহ ব্যক্ত করছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিএনপিকে তো নির্বাচনে আনতেই হবে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট। কাজেই আশা করা যায়, আগামী একদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে। বিএনপি ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ অবরোধ আন্দোলনের নামে বেশ দুর্নাম কামিয়েছে। ওই তিন মাসের সব অগ্নিসংযোগ, পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, হত্যা, বৃক্ষ নিধন, নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য বিএনপিই দায়ী এখনো আদালতে দায়ের করা মামলাসমূহ থেকে তা প্রমাণিত না হলেও সরকার দক্ষতার সঙ্গে সব দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপাতে পেরেছে। তাতে বিএনপির নির্বাচনবিরোধী একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সর্বশেষ ভিশন-২০৩০ ঘোষণার মাধ্যমে তারা সেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি অনেকটাই কাটাতে পেরেছে বলে মনে হয়। সর্বত্র নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা আশাবাদ জেগেছে এবং প্রায় সবাই সক্রিয় হচ্ছে। জনগণের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। অনেকদিন পরপর গ্রামে যাই। আশপাশের অনেকেই দেখা করতে আসেন। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মহিলারা এখন বেশ সচেতন। কয়েকজন বললেন, গতবার তো পাবলিকের ভোট লয় নাই, এবার নাকি লইব। এবার কিন্তু ভোট দিতে যামু এবং ঠিক জায়গায় সিল মারুম। ঠিক জায়গায় সিল মারুম বলতে মানুষ তাদের কোন আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছেন শাসক লীগের নেতারা কি তা অনুধাবন করছেন?

আমাদের দেশের বর্তমান রাজনীতি সম্পূর্ণই ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকা অথবা যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া। সরকারের অদল-বদল হয়, কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। বর্তমান সরকারের আমলে দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের তাতে লাভালাভের পরিমাণটা কত? বলা হয়, এমন উন্নয়নে যারা সরকারে এবং সরকারের সংশ্লিষ্টতায় থাকেন, উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি পান বা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন তারাই বেশি লাভবান হন। জনগণের লাভের হিসাবটা দিতে হবে সরকারকে। তবে এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যুনাল গঠন ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এটা একটা নন্দিত বিষয়। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এ ইস্যুতে কী করতে চায় ভিশন-২০৩০-তে কিন্তু তা স্পষ্ট করা হয়নি। বুধবারের (২৪ মে) যুগান্তরে একটি খবর বেরিয়েছে যে, বিএনপি নতুন ধারার রাজনীতি করবে। ক্ষমতায় গেলে জামায়াতকে তারা সরকারে রাখবে না। কিন্তু খবরে এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি যে, নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি হবে কিনা, ২০-দলীয় জোট অটুট থাকবে কিনা। কিছুদিন আগে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের সঙ্গে ভোটের জোটের পক্ষে কথা বলেছেন। জামায়াত ভোটের জোটে থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় থাকল কি থাকল না তাতে কী আসে যায়! নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করার কথা বলা হয়েছে ভিশন-২০৩০-তে। এই প্রজন্মের কাছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ তো একটি আবেগতাড়িত ইস্যু। বিএনপিকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট হতে হবে। বিএনপির সব সম্ভাবনা বিনাশে এ ইস্যুই আওয়ামী লীগের হাতে তুরুপের তাস হতে পারে। আওয়ামী লীগকেও পরিষ্কার করতে হবে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে তাদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আগামীতে ক্ষমতায় গেলে অব্যাহত থাকবে কিনা? হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য কাল হতে পারে। মানুষ বলবে তারা হেফাজতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধাতে পারলে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে রাখলে আওয়ামী লীগের বলার কী আছে? বাইরে এমনিতেই আলোচনা হচ্ছে আগামী নির্বাচনে ভোটের হিসাব ক্ষমতাসীনদের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিএনপিকে বোধহয় ভিতরে ভিতরে ভয় পাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির ধর্মীয় রাজনৈতিক ব্লকের ভোটে ভাগ বসানোর জন্যই হেফাজতের আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগ— এমন ধারণা ক্ষমতাসীনরা খণ্ডন করবে কীভাবে? সুপ্রিম কোর্ট থেকে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্যটি ২৬ মে রাতের বেলায় অপসারণের পর হেফাজতে ইসলামের সন্তোষ প্রকাশ ও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর ঘটনা প্রশ্নটি আরও জটিল করে দিয়েছে। অনেকেই একে সরকার-হেফাজতে সম্পর্কের নতুন মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এ ব্যাপারে সরকার একটি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে এই কারণে যে, বিএনপি এ ব্যাপারে সরকারকে কোনো ধরনের দোষারোপ করছে না। তারাও বলছেন এটা সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারাধীন বিষয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এমনটাই বলেছেন। তবে ভাস্কর্য অপসারণের ব্যাপারে দলীয় কোনো মতামত দিচ্ছে না তারা। তাদের মৌনতা কি সম্মতির লক্ষণ?

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com

উৎসঃ   bd-pratidin
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জিয়াউর রহমান
                                  
১৯৫৮ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে কাটিয়েছি। আমার মরহুম আব্বা তখন সরকারের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা ছিলেন। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের বড় বড় রাষ্ট্রীয় নেতাদের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসহ সভা-সমিতিতে তাদের উপস্থিতি থাকত। গান্ধী, নেহরু, সুভাষ বোস, জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, খাজা নাজিমুদ্দীন, শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমানÑ এই বড় নেতাদের নিয়ে অবসরে আব্বা গল্প করতেন। তাদের সিকিউরিটির কাজে নিয়োগ থাকাকালে চোখে দেখা অনেক বিরল ঘটনা আমার কাছে বলতেন।
আমাদের পরিবারসহ দেশের বেশির ভাগ মানুষকে দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের দুর্বিষহ কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্র ছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য অনুষদে আমরাই প্রথম ব্যাচের ছাত্র। চট্টগ্রামের পটিয়া ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় ঘাঁটি। প্রথম দিকে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শুরু করে কক্সবাজার পর্যন্ত বিরাট অঞ্চলজুড়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ। পাকিস্তানি সেনারা এলাকাটা শুরুতে তাদের দখলে নিয়ে আসতে পারেনি। কালুরঘাট থেকেই জিয়াউর রহমান ২৬ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নিজের (অলি আহমদ ও বেলাল মোহাম্মদের সহযোগিতায়) ড্রাফট করা স্বাধীনতার ঘোষণা বারবার স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দেন। জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এটা যেমন সত্য, তেমনি শেখ মুজিবের নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, এটাও সত্য। বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানি ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে দূরপাল্লার কামানের মাধ্যমে গোলা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হতো চট্টগ্রাম শহরে। এ ছাড়া পাকিস্তানি বিমান থেকে বোমা ও মেশিনগানের গুলি ছুড়ে এলাকাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছিল। একসময় তারা সফল হয় আংশিকভাবে। পটিয়ার যে বাড়িটিতে আমরা থাকতাম, সেটি আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা বোমায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ভস্মীভূত হয়ে যায়। তখন সম্ভবত ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ। আব্বার দীর্ঘ ২৮ বছরের চাকরি জীবনে সঞ্চিত যা কিছু ছিল, তখন সব কিছুই নিঃশেষ হয়ে যায়। শুধু পরিধানে এক টুকরো বস্ত্র ছাড়া আর কিছুই আমাদের ছিল না। সেই সময় রেডিও ছিল সংবাদ সংগ্রহের একমাত্র সাথী। আজ এক পাড়ায়, কাল আরেক পাড়ায় কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ ৯ মাস। এক বেলা খেয়েছি, হয়তো আরেক বেলা দৌড়ের ওপরই থাকতে হয়েছে। পটিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের নির্দেশেই ওই অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী পরিচালিত হতো। একদিন জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ প্রদানের জন্য পটিয়া থানায় এসেছিলেন। তখন পটিয়া থানার ওসি ছিলেন লুৎফর রহমান, বাড়ি সিলেট। ওই দিন আমরা অনেকেই থানায় গিয়ে জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। দেখি, বারান্দায় বসে ভাবগম্ভীর দৃষ্টিতে সিগারেট খাচ্ছেন এবং স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি আলাপ করছেন। কিছুক্ষণ পরই পাঁচ ব্যক্তিকে থানায় ধরে নিয়ে আসা হয়। জিয়া স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলেন। অপরাধী তিনজনকে শাস্তির জন্য রেখে বাকি দু’জনকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। যারা দুষ্কর্মে লিপ্ত এবং ধর্ষণ, লুটপাট ইত্যাদি কাজে সম্পৃক্তÑ এ ধরনের লোকদেরই শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হতো। খান সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হতো বেশির ভাগই রাতের বেলায়। আমাদের এমনও অনেক রাত গেছে যখন ঘরের পাশে পুকুরের পানিতে লুকিয়ে কাটাতে হয়েছে। রাতের বেলা কামানের গোলা আর ৬ ইঞ্চি মর্টারের গোলার আঘাতে পুরো বাড়ি প্রকম্পিত হয়ে উঠত। গুলিতে টিনের ঘরের টিন ছিদ্র হয়ে যেত। আমরা পরে যে বাসাটি ভাড়া নিলাম সেটাও নিরাপদ ছিল না। যতই দিন যাচ্ছিল, যুদ্ধ ততই বিভীষিকাময় রূপ নিলো। রাতে যখন মর্টারের গর্জন শুরু হতো, তখন আমরা মেঝেতে শুয়ে পড়তাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের ডানে-বামে প্রচুর গুলি পড়েছে; কিন্তু শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়নি। যুদ্ধের তাণ্ডব এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, পটিয়ায় অবস্থান করা মোটেই নিরাপদ ছিল না। সকালে উঠেই দেখতাম, রাস্তায় লাশের বহর। শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই পরিবারের সবাই চট্টগ্রাম শহরের নন্দন কানন এলাকায় ছোট একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। সেখানেও বেশি দিন থাকতে পারলাম না। চলে এলাম ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় একটি বাড়িতে। সেই বাড়িতেও বেশি দিন থাকা যায়নি। কারণ পাশে ছিল সেনাদের সহযোগীদের ক্যাম্প। একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ধাওয়া করতে গিয়ে ওই ক্যাম্প থেকে বেপরোয়া গুলি চালানো হয়। একটি গুলি বাসার জানালার কাচ ভেঙে দেয়ালে আঘাত করে। আব্বা আর আমি তখন ওই রুমেই আলাপ করছিলাম। গুলিটি আব্বার মাথা ঘেঁষে গেলেও তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। তবে বিল্ডিং ছিদ্র হয়ে যায়। যুদ্ধের সময়ে আল্লাহ আমাদের পরিবারের সদস্যদের কিভাবে যে সাহায্য করেছেন তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
একদিন দুপুরে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী তার বাহিনী নিয়ে পটিয়া এলে আব্বাকে ডেকে নেয়া হয়। তিনি পটিয়া থানার ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের প্রধান ছিলেন। আমরা সবাই ভয়ে অস্থির। মনে করেছি, তিনি আর ফিরে আসবেন না। সন্ধ্যা হওয়ার পরও যখন আব্বা বাসায় ফিরছেন না, তখন আমাদের পরিবারের অবস্থা কেমন, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আম্মা কুরআন তিলাওয়াত শুরু করেছেন দুপুর থেকে। ভাইবোনেরা দোয়াদরুদ পড়ছি। খাওয়া-দাওয়ার কথা সবাই ভুলে গেছি। আল্লাহর রহমতে আব্বা রাত ১১টায় বাসায় ফেরেন। তার পুরো শরীরে তখন ঘাম; মুখটা মলিন। অনেকটা হতবিহ্বল। কিভাবে আল্লাহ রক্ষা করেছেন সেই কথাই তিনি ভাবছিলেন। শুকরিয়া আদায় করেছেন আল্লাহর দরবারে। ক্যাম্পে গিয়ে অনেকেই নিখোঁজ হয়েছেন। অর্থাৎ নিহত হয়েছেন। আব্বা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষের স্বার্থে সব ধরনের কাজ করতেনÑ এটাই ছিল তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ। 
যার যতটুকু স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রয়েছে তাকে সেই প্রাপ্যটুকু দিলে আজ যে বিতর্ক বিরাজ করছে তা থাকত না। এ জন্য ইতিহাসবিদদের সঠিক তথ্য অন্বেষণ করা প্রয়োজন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ তার বইতে জানিয়েছেন, ওই বেতারকেন্দ্রে পৌঁছেই মেজর জিয়া স্বহস্তে একটি ঘোষণা ড্রাফট করেন। স্বাধীনতার এই ঘোষণাটিই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান প্রথমে ইংরেজিতে ও পরে বাংলায় প্রচার করেছেন, যা মানুষ শুনতে পেয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি নিতে তখন রাজনীতিবিদেরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। জিয়ার এই ঘোষণা ৩০ মার্চ পর্যন্ত কিছুক্ষণ পরপর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়। জিয়া একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ হাতে ড্রাফট করা স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দিন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকালেই স্বীকার করে গেছেন শহীদ জিয়াই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
১৯৮১ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে যান, তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন সঞ্জীব রেড্ডি। তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার সম্মানে প্রদত্ত ভোজসভায় বলেছিলেন, আপনি একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কারণে আপনার মর্যাদা বাংলাদেশের ইতিহাসে জোরালোভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (Your position is already assured in the annals of the history of your community as a brave freedomfighter who was the first to declare the independence of Bangladesh (ref : Bangladesh In International Politics by M. Shamsul Huq. 1993 : 96)
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, আমার জানা মতে, এমন কি এখন পর্যন্ত শেখ মুজিব নিজে স্বাধীনতার কথা বলেননি। তার ইংরেজি বক্তব্য ছিল এ রকম : He himself, so far as I know, has not asked for independance even now ১৯৭১ সালে ১৪ এপ্রিল লন্ডনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য : Sheikh Mujib himself has not, in any certain sense, declared Bangali independence..
২০০২ সালের মে মাসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী অনিল সরকার ও তার সহকর্মীরা ঢাকা সফরে এসে জোরালো ভাষায় বলেছেন এক আলোচনা সভায়, ‘জিয়াউর রহমানই প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’ এই ঘোষণার বাণীটি আমরা স্বদেশে বসে নিজের কানেই শুনেছি। প্রখ্যাত ভারতীয় কূটনীতিক জে এন দীক্ষিত তার লিখিত গ্রন্থ ‘লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এ বলেছেনÑ A major political mistake at the surrender ceremony was the indian military high command, failure to ensure the presence of general MAG Osmani, commander from the Bangladesh side on the joint command, at the ceremony and making him a signatory.
একটি কথা উল্লেখ করতে হয় অর্থাৎ জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লগ্ন থেকেই চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম (রামগড়) যুদ্ধরত অবস্থায় ছিলেন এবং ’৭১ সালের ডিসেম্বরে তিনি সিলেটে যুদ্ধ পরিচালনা করে ১৪ ডিসেম্বর সিলেট শত্রুমুক্ত করেন।
এ লেখাটি শেষ করব দার্শনিক টমাস কারলাইলের একটি উক্তি দিয়ে। তিনি বলেছেনÑ A hero appears in the world according to the needs of his time অর্থাৎ ‘কালের প্রয়োজনেই পৃথিবীতে একজন বীরের আবির্ভাব ঘটে।’ জিয়াউর রহমান সেই ধরনেরই একজন। মুসলিম বিশ্বের ক্রান্তিকালে স্বদেশ, উম্মাহ এবং উপমহাদেশের জন্য তিনি সাড়ে চার বছরে বহু কাজ করেছেন। ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধ করা, সার্ক গঠন, বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করা এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলাসহ অনেক অবদান তার।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক
ভিশন-২০৩০ কতটা অনুসরণ করবে বিএনপি?
                                  

আলোচ্য ভিশনটির মাধ্যমে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের উন্নয়নের মাধ্যমে জাতিকে এটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি এই ভিশন বা রূপকল্পটিতে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, আগামীতে ক্ষমতায় ফিরে এলে তিনি সেসব প্রতিশ্রুতি পালনের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেশবাসীকে উপহার দেবেন। এক নম্বর প্রতিশ্রুতিটি হচ্ছে, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর যে একক ক্ষমতা আছে, সংবিধান সংশোধন করে তা হ্রাস করার মাধ্যমে তার ক্ষমতায় একটি ভারসাম্য আনা হবে। কারণ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি একনায়কতন্ত্রী শাসনের জন্ম দিয়েছে। এটা সংসদীয় সরকার পদ্ধতির স্বীকৃত নিয়মের পরিপন্থী।

 

এটা সত্য, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেক বেশি। অনেকটা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মতো। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ইতিপূর্বে পূর্ণকালীন দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং একক ক্ষমতা চর্চা করেছেন। এটা যে অনেকটা স্বৈরাচারী ও একনায়কতন্ত্রী শাসন, সে উপলব্ধিটা তখন কেন জাগ্রত হল না? এখন তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে ক্ষমতায় যে ভারসাম্য আনবেন, তা তাদের অতীতের কার্যকলাপ সমর্থন করে না। তাদের মনোনীত দলীয় রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ন্যায়বিচারের স্বার্থে দুয়েকটি বিষয়ে অনুমোদনদানে অসম্মতি জানালে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় জীবন বাঁচাতে মহাখালীর রেললাইন ধরে দৌড়াতে বাধ্য হন। তার বাড়ির বসার ঘরে বিএনপির কর্মীরা অগ্নিসংযোগ করেছিল বলেও তখন খবর বের হয়েছিল।

সেই একক ক্ষমতা ভোগকারী খালেদা জিয়া যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করবেন, সেটা কী করে বিশ্বাস করা যায়! তাছাড়া তিনি প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির কথা বলেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে উপরোক্ত ব্যবহারগুলো কতটা প্রতিহিংসাহীন ছিল? তাছাড়া ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলার পর সরকারের ভূমিকা কি গণতন্ত্রসম্মত ছিল? বিরোধী দল ও মতের প্রতি এটা কি মোটেই সহনশীলতার পরিচয় বহনকারী ছিল? তাছাড়া ওই হামলার প্রতিটি আলামত ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে বা দুর্বল করতে অত্যন্ত শান্ত মস্তিষ্কে এবং সুকৌশলে নষ্ট করা হয়েছিল। এটা দেশবাসীর অজানা নয়। ভিশনের আরেকটি প্রতিশ্রুতি হল, ‘জাতীয় সংসদকে সব জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হবে। সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

প্রশ্ন হল, বিএনপির দুই আমলে তা কেন করা হল না? বরঞ্চ ২০০৯-১৪ সালে বিএনপি বিরোধী দলে গেলে খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে গোটা ৫ বছরের মধ্যে মাত্র ৫ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। বিরোধী দল হিসেবে তারা মাসের পর মাস সংসদে অনুপস্থিত থেকেছেন। একনাগাড়ে ৯০ দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ খারিজ হওয়ার বিধান আছে। সে ভয়ে তারা ৯০ দিন শেষ হওয়ার আগের দিন সংসদে উপস্থিত হতেন। তবে সংসদের কাজ না করে সদস্য হিসেবে সব আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা নিতে তাদের কোনো অনীহা দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের রেকর্ডও খুব উজ্জ্বল নয়। তবে বিএনপির তুলনায় ভালো। প্রশ্ন হল, সংসদে উপস্থিত না হয়ে এবং সংসদীয় দায়িত্ব পালন না করে এই যে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা, সেটা কতটা নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন অবৈধ কাজ? অথচ দেশ ও জাতির জন্য আইন ও নীতিপ্রণয়ন সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব। আর বিরোধী দল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। সংসদে গিয়ে সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়া তাদের অতি আবশ্যকীয় কর্তব্য। সেটা বিএনপি করেনি।

ভিশনের সর্বত্র সুনীতি, সুশাসন ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। ২০০৬-এর মেয়াদ শেষে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছিল, তাতে ভুয়া ভোটার তালিকা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগে বিএনপি যে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নেয়, তা কারও অজানা নয়। দলীয় লোক বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে তাদের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিচারপতিদের অবসরগ্রহণের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছরে উন্নীত করেন। সেই অপকৌশলও যখন জনতার আন্দোলনে ভেস্তে গেল, তখন নানা কারচুপি ও কারসাজির আশ্রয় নেয়া হল। তা-ও যখন সফল হল না, তখন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মদের মাধ্যমে নির্বাচনের পাঁয়তারা চলল। ব্যাপক গণআন্দোলনে সেটাও অবশ্য ভেস্তে গেল। তবে রাষ্ট্রপ্রধানকে সরকারপ্রধান করাটা কতটা আইনসম্মত ছিল, সে প্রশ্নের জবাব খালেদা জিয়া বা তার তখনকার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দেবেন কি? খালেদা জিয়া তার ভিশনে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা বলেছেন। উপরোক্ত বিয়গুলোর ব্যাপারে তখন তার এ আশঙ্কার উদ্রেক ঘটেনি কেন?

বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে তার উদ্বেগ যদি আন্তরিক হয়, তবে তা প্রশংসনীয়। তবে কথা হল, তার বিরুদ্ধে বর্তমান দুটি চলমান মামলায়- জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়- তিনি ১৪০ বার সময় নেন কেন? আর ওই মামলায় প্রায় ৬২ দিন তিনি অসুস্থতা এবং হঠাৎ অসুস্থতার কারণে আদালতে অনুপস্থিত থাকেন কেন, সেটাও আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন জাগে, সত্যের শক্তি থাকলে মামলা মোকাবেলা করতে ভয় কীসের! তবু আমাদের আশা রইল, তিনি আলোচ্য মামলা দুটি মোকাবেলা করে সসম্মানে বেরিয়ে আসবেন।

খালেদা জিয়া বর্তমান বিচারব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলেছেন। বলেছেন, অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত করার লক্ষ্যে সুপ্রিমকোর্টের অধীনে আলাদা সবিচালয় করা হবে। এসবই সাধু প্রস্তাব; কিন্তু কথা হল, তিনি কথা দিয়ে কথা রাখবেন কিনা। বিচারপতি লতিফুর রহমান একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন। সেই সরকারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার লেখা একটি বই আছে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিলে খালেদা জিয়া উপরোক্ত সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ব্যারিস্টার ইশতিয়াককে ফোন করেন। ফোনে তিনি ইশতিয়াক সাহেবকে বলেন, ‘নির্বাচনে ইতিমধ্যে আমরা জয় লাভ করেছি। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সরকারের অধিষ্ঠিত হবো। বিচার বিভাগকে উপরোক্ত বিচ্ছিন্ন বা আলাদাকরণের কাজটি আমাদের হাতেই ছেড়ে দিন।’ তবে রেকর্ড বা সত্য হল, ক্ষমতায় গিয়ে তিনি সেই প্রতিশ্রুত আলাদা বা বিচ্ছিন্নকরণের কাজটি করেননি।

খালেদা জিয়া দেশে সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন। এসব কথা তার দুই মেয়াদের প্রাক্কালে ঘোষিত মেনিফেস্টোতেও ছিল। এ দুটি মেনিফেস্টোর দুটি প্রতিশ্রুতি তারা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেছেন বলে আমরা জানি না। বরঞ্চ শেষ মেয়াদে (২০০১-২০০৬) দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম চালানোর যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার উল্টোটিই দেশবাসী সবিস্ময়ে দেখেছে। দেশে দুর্নীতি তখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়েছিল হাওয়া ভবন। এই ভয়াবহ দুর্নীতির খবর সারা বিশ্বে প্রকাশ পায় বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর জরিপে। তখন পরপর ৪ বার বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশের শিরোপা অর্জন করে এ জরিপে। এখানে বলা দরকার, টিআই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির ওপর জরিপ করে প্রতি বছর ফল প্রকাশ করে।

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের তিনটি বড় বৈশিষ্ট্যের একটি। বিএনপির ভিশনে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে, যা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে বোঝায়। বিএনপি তাদের শেষ মেয়াদে (২০০১-২০০৬) উপজেলা ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকারকে স্থগিত করে দেয়। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মানসে আলোচ্য ভিশনে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও শক্তিশালী করে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। যদি তাই হয়, তাহলে তাদের শেষ মেয়াদে আওয়ামী লীগ আমলে প্রতিষ্ঠিত ওই ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল কেন?

বিএনপির অতীতের এমন নেতিবাচক রেকর্ড বিবেচনা করলে তাদের ভিশনের ওপর বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ করার আগে এটাও বলা দরকার, ভিশনে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ব্যাপারে অনেক কথা বলা হলেও ’৭১-এর মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে তারা একটি কথাও বলেননি। বলবেন কী করে? কারণ এ মানবতাবিরোধী অপরাধীরে বেশ কয়েকজনকে বিএনপি মন্ত্রী বানিয়েছিল, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং ৩০ লাখ স্বাধীনতাকামী মানুষের হত্যার জন্য দায়ী। এ প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্যই যে তারা সুন্দর সুন্দর বাক্য উচ্চারণ করেছেন, তা মানুষের কাছে পরিষ্কার। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, You can fool some people for sometime, but you cannot fool all people for all time. অর্থাৎ তোমরা কিছুসংখ্যক মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারো; কিন্তু সব মানুষকে সবসময় বোকা বানাতে পারো না।

মো. মইনুল ইসলাম : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মহাজোট নাকি মহাফ্যাসাদ! সানাউল হক নীরু
                                  

যারা একদিন মহাজোট সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন, তাঁরাই দেখছি এখন মহা ফাঁপড়ে !! রাম, বামের ভোটের বাক্স ফাঁকা, তাই এখন মহাজোট সরকারের অন্যতম তুরুপের তাস .... হেফাজতে ইসলাম। একেবারে ইনস্ট্যান্ট এনার্জি !! ভোটের হিসেবে কিছুটা হলেও বদলে যেতে পারে। রাজদন্ড কিংবা ক্ষমতার মসনদ কোন ধর্ম মানে না। রাজনীতি কোন সরল অংক নয়, এটা গরল এবং বেইমানীর খেলা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী জেনারেল এবং এটর্ণী জেনারেল মহোদয় একই সুরে বলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে মূর্তি সরানোর বিষয়টি একান্ত প্রধান বিচারপতির নির্দেশে ঘটেছে এবং দেশের মানুষও তা বিশ্বাস করেছে। আসলে দেশের প্রধান বিচারালয়ের সামনে এটা স্থাপনের নির্দেশ কারা দিলো কিংবা তা সরানো হলোও কিভাবে ? মূর্তি সরানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এরা কি ইসলামপন্থি, ধর্ম বিদ্বেষী কিংবা উদারপন্থী !!! বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের সেন্টিমেন্ট বিরোধী এবং ইসলামী চেতনা বিদ্বেষী মূর্তি প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি কি কোন রাজনীতির সুস্থ উপাদান হতে পারে?

নষ্ট সমাজে উৎকট দুর্গন্ধের মহামারী!
                                  
প্রথম ঘটনাটি বছর তিনেক আগের। কেতাদুরস্ত এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়ের শুরুতে তিনি হ্যান্ডশেক করে আমার হাতটিকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের শক্তিমত্তার জানান দিলেন। তারপর নিজের বংশলতিকার বিস্তারিত বর্ণনা এবং বাড়িগাড়ির হিসাব দেয়ার পাশাপাশি তার পরিধেয় বস্ত্র, ঘড়ি, কলম, আংটি আর জুতার মূল্যমান সম্পর্কে সচেতন করলেন। কথা প্রসঙ্গে আমার বয়স জানলেন এবং তার বয়স সম্পর্কে আমার কী আন্দাজ, তা জানতে চাইলেন। ইতস্তত করে যখন বললাম, হয়তো পঞ্চান্ন বা ছাপান্ন হবে, তিনি হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তারপর বড় বয়সী তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘হলো না! হলো না! সবার মতো আপনিও ভুল করলেন। আমার বয়স বর্তমানে আটষট্টি বছর।’
আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে তার সুদীর্ঘ যৌবনের রহস্য জানাতে গিয়ে প্রথমেই জানালেন, তিনি নিয়মিত রেড ওয়াইন খান এবং সমবয়স্ক মেয়েদের সাথে মেলামেশা করেন। তার সাথে কোন কোন সুন্দরী নায়িকা, গায়িকা এবং মডেলকন্যার ‘ইতিউতি’ রয়েছে, তার রসময় আলোচনা করে তিনি আমাকে লোভাতুর করতে চেষ্টা করলেন। তার ধারণা হলোÑ আমার ধনসম্পত্তি, ব্যবসাবাণিজ্য এবং অর্থবিত্তের যে সফলতা সেই সময়ে ছিল, তার কিছুটা হাতিয়ে নেয়ার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়টি আমার ওপর প্রয়োগ করলে তিনি হয়তো সফল হবেন; কিন্তু তার ফাঁদে পা না দিয়ে যখন আমার চিরায়ত অভ্যাস মতো নীতিবাক্য আওড়াতে শুরু করলাম এবং বৃদ্ধ বয়সে অনাচারে লিপ্ত থাকার জন্য তাকে ভর্ৎসনা করলাম, তখন তিনি যারপরনাই বেদনাহত ও অপমানিত বোধ করে চলে গেলেন। আমি সেক্রেটারিকে ডেকে বলে দিলাম, আগামীতে এই লোককে যেন আমার সাথে সাক্ষাতের কোনো অনুমতি দেয়া না হয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি বছর দুয়েক আগের। একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের বৈঠকে দুই বৃদ্ধের সাথে চোখাচোখি হতেই তারা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। মুহূর্তের পরিচয় এবং ক্ষণিকের আলাপের সূত্রে তারা নিজেদের অশ্লীল এবং অবৈধ যৌনাচার নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু করলেন। কথা বলছিলেন মূলত দুই বৃদ্ধ, আর আমি ছিলাম শ্রোতা। তারা উভয়েই যথেষ্ট ধনাঢ্য, জাত ব্যবসায়ী এবং সেই সাথে শয়তানি কর্মে একবারে পাকা ও সিদ্ধহস্ত। নিজেদের কুৎসিত কুকর্ম এবং বিকৃত আচরণ নিয়ে তাদের কোনো অনুশোচনা তো দূরের কথা, বরং এসব নিয়ে তারা রীতিমতো অহংকার অনুভব করেন। তাদের কথাবার্তা মুদ্রণের অনুপযোগী এবং ওগুলো শোনাও কোনো রুচিশীল ভদ্রলোকের জন্য রীতিমতো জাহান্নামের আজাবের শামিল। তারা বাস্তবে কতটুকু অপকর্ম কোন পরিধিতে করতে সক্ষম, তা বুঝা না গেলেও এ কথা স্পষ্ট বুঝা যায়, বৃদ্ধদ্বয় তাদের কুকর্ম বর্ণনা করতে গিয়ে যতটা না পৈশাচিক আনন্দ লাভ করেন, তার চেয়েও বেশি আনন্দ পান ওসব নোংরা কথা প্রচার করে।
এবার বালকদের প্রসঙ্গে আসি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠরত বালক-বালিকাদের প্রেমাচার ইদানীং সমাজে রীতিমতো মহামুসিবত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বালিকাদের যন্ত্রণায় স্কুলের শিক্ষকেরা বিব্রত। অন্য দিকে, বালকেরা তাদের তরুণী শিক্ষয়িত্রীদের যেভাবে অহরহ ইভটিজিং করে থাকে, তা শুনলে কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ মেজাজ ঠিক রাখতে পারবেন না। রাজধানীর নাম করা একটি সরকারি বিদ্যালয়ে দুইজন নতুন মধ্যবয়সী শিক্ষয়িত্রী যোগদান করার পর ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে পড়–য়া বালকেরা যে বিপত্তি ঘটিয়েছিল, তা দেখার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল। শিক্ষয়িত্রী দু’জনের মধ্যে একজন অপেক্ষাকৃত গৌরবর্ণের এবং অন্যজন কৃষ্ণকায়। বালক ছাত্ররা তাদের দেখে শিস দেয়। কাসে হইহুল্লোড় করে এবং নানা রকম বাজে মন্তব্য করে তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। বালকেরা ফর্সা শিক্ষিকাকে সানি লিয়ন এবং কালো বর্ণের শিক্ষিকাকে কালি লিয়ন বলে ইভটিজিং পর্যন্ত করেছে। 
শিক্ষয়িত্রীদ্বয় বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানালে তিনি অভিযুক্ত ছাত্রদের অভিভাবকদের ডেকে পাঠান। একটি কাজে উল্লিখিত বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। প্রধান শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীরা অনুরোধ জানান, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অভিযুক্ত ছাত্রদের এবং তাদের অভিভাবকদের বাস্তব অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য। নিজের লেখকসত্তার স্বভাবজাত কৌতূহলের জন্য আমি থেকে গেলাম এবং হাল আমলের নষ্ট সমাজের নোংরামির তীব্রতা অনুভব করার একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ পেয়ে যাই। লক্ষ করলাম, শিক্ষয়িত্রীদ্বয় যখন অশ্রুসজল নয়নে কান্নাভরা কণ্ঠে অভিযোগ করছিলেন, তখন অভিযুক্ত বালকেরা মুচকি মুচকি হাসছিল। তাদের বাবারা ছিলেন নির্বিকার এবং মায়েরা ছিলেন বিষণœ। আরো জানলাম, অভিযুক্ত বালকেরা সত্তর/আশি হাজার টাকার দামি মোবাইল সেট ব্যবহার করে এবং সরকারি গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয়ে আসে। কারণ তাদের অভিভাবকেরা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তা।
বালকদের নষ্টামির পেছনে কিছু অভিভাবক কিভাবে ভূমিকা রাখেন, তা হয়তো অনেকেই জানেন; কিন্তু এসব কাণ্ডকারখানা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে কত যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, তার খবর আমরা ক’জন রাখতে পারি। খুবই অসংযত, উচ্ছৃঙ্খল, অশ্লীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত মধ্যবয়সী এক ব্যবসায়ী হঠাৎ একদিন তার স্কুলপড়–য়া বড় ছেলের কামরায় ঢুঁ মেরে দেখেন, ছেলেটি তার কম্পিউটারে অশ্লীল ছবি দেখছে। লোকটি ছেলেটিকে বেদম প্রহার করলেন, ছেলের মাকেও মারলেন এবং মনের দুঃখে ঘর ছেড়ে অফিসে চলে গেলেন। সারা দিন অফিস করার পর মনের দুঃখ আরো বেড়ে গেল। মনের মধ্যে একধরনের বৈরাগ্য চলে আসার কারণে সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি রাতে অফিসেই থাকবেন। সন্ধ্যার পর তার মনে ছেলের কুকর্মের কথা বারবার ভেসে উঠতে লাগল। দুঃখ ভোলার জন্য তার কয়েকজন বন্ধু ও বান্ধবীকে অফিসে দাওয়াত দিলেন। তার মনে হলো, সবাই মিলে মদ খেয়ে এবং আলাপ-আলোচনা বা মেলামেশা করলে হয়তো মনের দুঃখ কিছুটা হলেও কমে যাবে। পরিকল্পনা মতো লোকটি তার অফিসে সুরা ও সাকির আয়োজন করে সারারাত মনের দুঃখ দূর করার চেষ্টা করলেন এবং সকালে মনের সুখে বাসায় ফিরে গেলেন আরামে ঘুমানোর জন্য।
বৃদ্ধ ও বালকদের কাহিনী বলার পর নারীদের সম্পর্কে দুটো বাস্তব ঘটনা বলে শিরোনামের প্রসঙ্গে চলে যাবো। নারীদের প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল রাজধানীর কথিত ধনীদের একটি এলাকায়। ভদ্রমহিলা মধ্যবয়সী এবং স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী। তার স্বামী কাজকর্মের কারণে প্রায়ই বিদেশে অথবা ঘরের বাইরে থাকেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই রাজধানীর বিভিন্ন কাব এবং পাঁচতারা হোটেলের বিভিন্ন পার্টিতে যান। স্বামী দেখতে অতটা সুন্দর না হলেও সব কাজে ভীষণ দক্ষ। মুহূর্তেই বিভিন্ন মহিলার সাথে খাতির জমিয়ে ফেলেন এবং ইচ্ছেমতো কারো সাথে হ্যান্ডশেক, কারো সাথে কোলাকুলি কিংবা গালে গাল লাগিয়ে হিন্দি সিনেমা বা পশ্চিমা সমাজের ফ্যাশন অনুযায়ী শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। স্ত্রীর খুব ইচ্ছে হয়, তিনিও এমনটি করবেন; কিন্তু তার স্বামীর মতো কোনো সাহসী পুরুষ এগিয়ে এসে তার সাথে যেমন ঘনিষ্ঠ হয় নাÑ তেমনই নিজেও সাহস করে উপযাচক হয়ে কোনো পুরুষের সাথে মনমতো ‘খোলামেলা’ মেলামেশা করতে পারেন না। 
মহিলা মনের দুঃখ বহু দিন বয়ে বেড়ালেন। তারপর নিজের দুঃখের কথা একদিন ঘরের কাজের বুয়ার কাছে খুলে বললেন। কারণ বুয়াটিকে তার সব দিক থেকেই চালাক-চতুর এবং সফল বলে মনে হয়। বুয়ার অনেক ঘটনাই তিনি জানেন এবং প্রায়ই সময়-সুযোগ পেলে ওসব ঘটনা শুনে তিনি নিজে নিজে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। বুয়া তাকে বুদ্ধি দিলো যে, পার্টিতে গিয়ে এলোমেলো ঘোরাফেরা করে নাগর পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত তার যে বয়স, সে বয়সে কোনো প্রেমিক পাওয়া দুষ্কর। কারণ প্রেমিকেরা সব সময় অল্প বয়স্ক মেয়েদের পেছনে ছোটে। সুতরাং তাকে টার্গেট করে এগোতে হবে এবং ছলে বলে কৌশলে টার্গেটকে করায়ত্তে নিয়ে এসে প্রেমিক হতে বাধ্য করতে হবে। বুয়ার পরামর্শে ভদ্রমহিলা খুবই থ্রিল অনুভব করলেন এবং যেকোনো মূল্যে নিজের লিপ্সা বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করে ফেললেন। 
ভদ্রমহিলা টার্গেট হিসেবে তাদের পাশের ফ্যাটের হাবাগোবা অথচ শিক্ষিত ও ভদ্রলোক বলে পরিচিত ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে বসলেন। তারপর সুযোগ বুঝে একদিন নির্জন সন্ধ্যায় ভদ্রলোককে জরুরি কথা আছে বলে বাসায় ডেকে নিলেন। ভদ্রলোক ঢোকামাত্রই মহিলাটি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং আরো কিছু ঘনিষ্ঠ কর্ম করে ফেললেন মুহূর্তের মধ্যে। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে বুয়াটি বেশ দক্ষতার সাথে সে দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করল। পরে কয়েক মাস মহিলাটি নিরীহ গোবেচারা ভদ্রলোকটিকে ধারণ করা ভিডিও কিপের ভয় দেখিয়ে তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুললেন। শেষমেশ ভদ্রলোকটি লাজলজ্জা ভুলে তার এক গোয়েন্দা বন্ধুর কাছে ঘটনা খুলে বলেন এবং নষ্ট সমাজের এহেন উৎকট দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ক্রয় করা ফ্যাট ভাড়া দিয়ে অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন।
এবার এক যুবতী ও চতুর নারীর কাহিনী শোনা যাক। এই নারী নি¤œবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবা বালিকা বয়সে তাকে বিয়ে দেন তার চেয়েও প্রায় ২০ বছর বেশি বয়সী বেসরকারি কলেজের এক প্রভাষকের কাছে। নারীটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েন। ধনাঢ্য লোকদের আকৃষ্ট করার যাবতীয় কলাকৌশল রপ্ত করে ফেলেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই চরিত্রহীন টাকাওয়ালাদের সান্নিধ্য পেয়ে নিজের বৃদ্ধ স্বামীকে তা মেনে নিতে বাধ্য করেন। একটু উন্নত জীবন, দামী পোশাক-আশাক এবং দু’হাতে টাকা খরচ করার অবাধ সুযোগের জন্য তিনি অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে চরিত্রহীন ধনীদের দেউলিয়া করার কাজে দক্ষতা অর্জন করে ফেলেন। তার দ্বারা প্রতারিত ধনীরা ভুক্তভোগী হওয়ার পর লোকলজ্জার ভয়ে সব কিছু চেপে যেতে বাধ্য হন, কিন্তু কোনো ধর্ষিতা নারীর মতো সাহস করে প্রতারক যুবতীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে পারেন না। ফলে ধুরন্ধর মহিলাগুলো দিনকে দিন তাদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি করে নষ্ট সমাজকে সম্পূর্ণরূপে পচিয়ে দেয়ার মিশনে উঠেপড়ে লেগেছেন।
আমাদের সমাজের উল্লিখিত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে একত্র করে কেউ যদি মূল্যায়ন করেন, তবে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, দুর্নীতি, যৌনতা, অশ্লীলতা, অনিয়ম এবং অনাচার-ব্যভিচার আমাদের চর্তুদিক থেকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরেছে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিবেকবোধ, নীতি-নৈতিকতা এবং ধর্মবোধ নির্বাসনে যেতে বসেছে। প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি, অত্যাচার ও অবিচার একত্র হয়ে ভুক্তভোগীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। শিষ্টের দমন এবং দুষ্টের পালন এখন অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির সফলতার মূলমন্ত্র বলে বিবেচিত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে মোনাফেকি ও বিশ্বাসঘাতকতা ভয়াবহরূপে বিস্তার লাভ করছে জীবনসংহারী মহামারী রোগ-জীবাণুর মতো। ফলে মেধাবী ও সামর্থ্যবানেরা শান্তির সন্ধানে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন এবং নিরীহ ও দুর্বল লোকেরা সব কিছু থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নির্জনতা বা একাকিত্বকে বেছে নিয়েছেন।
সমাজে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের উল্লম্ফন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অপরাধীরা মজলুমের ভাগ্যবিধাতারূপে আবির্ভূত হয়েছে। সত্য ও ন্যায়কে নির্বাসনে পাঠানোর যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করার পর মিথ্যাচার, ব্যভিচার, অনাচার এবং অবিচারকে জাতীয় পোশাক-পরিচ্ছদ আর অলঙ্কার বানানোর তোড়জোড় পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, মানবতা, নম্রতা-ভদ্রতা, শালীনতা ইত্যাদি সুবচন এখন অবধি বই-পুস্তকে লেখা আছে। তবে নষ্ট সমাজের উৎকট দুঃসহ দুর্গন্ধ মহামারী আকারে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বই-পুস্তকের ভালো ভালো কথা, উপদেশ, সুবচন এবং নীতিকথা উবে যায় কি না সে ব্যাপারে সৎ ও সজ্জন মুরব্বিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারণ কিয়ামতের আগে লক্ষণ হিসেবে কুরআনের বর্ণমালাগুলো উঠিয়ে নেয়া হবে বলে যুগযুগান্তর ধরে আমরা যা জেনে আসছি, তা যদি আমাদের জীবদ্দশায় ঘটে যায়; তবে আমাদের মতো অভাগা ও কপাল পোড়াদের জায়গা কোথায় হবে, তা কেবল আল্লাহ মালিকই বলতে পারবেন।
 
বিএনপির নারীবিহীন রংধনু রাষ্ট্র
                                  

নির্বাচন সন্নিকটে। নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে এর মধ্যেই। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দল, কর্মসূচি ইত্যাদি নিয়ে ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে। ক্ষমতাশীল দল আওয়ামী লীগ যদিও অনেকদিন আগে থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বলা শুরু করেছে। সম্প্রতি আমাদের দেশের আরেক বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি) ঘোষণা করেছে তাদের আগামীর পথচলার নির্দেশিকা যাকে তারা বলছে ভিশন ২০৩০। রাজধানীর একটি দামি হোটেলে বসে দলের চেয়ারপার্সন সে ভিশন পড়ে শুনিয়েছেন। আমরাও আশাবাদী হয়েছি। যাক এতদিনে তাহলে মৃতপ্রায় দলটি নিজেদেরকে নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে সর্বোপরি দেশকে নিয়ে ভাবার সময় পেয়েছে। কারণ আমরাও চাই এমন একটি বড় দল যাদের এখনো প্রচুর কর্মী-সমর্থক আছে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াক, দেশের কথা বলুক, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার শপথ নিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসুক।

বিএনপির ভিশন ২০৩০ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার সুযোগ পাইনি তবে মোটা দাগে তারা যে এরিয়াগুলোকে প্রধান বলে মনে করে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সেগুলো দেখেছি। অনেক ভালো কথা আছে। আমাদের এই দেশকে একটি রংধনু রাষ্ট্র হিসেবে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদিও আমি ভালো বুঝতে পারিনি সেটি আবার কেমন রাষ্ট্র? তারপরও মোটা মাথায় ধরে নিয়েছি হয়তো রংধনুর মতো রঙিন হবে আমাদের এ দেশটি। হয়তো তখন আবার আমরা গাইতে পারব আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুলপরী। কিন্তু বিএনপির ভিশনে কোথাও এই ফুলপরীদের স্থান দেখলাম না। বিএনপির সাজানো বাগানে কী পরীদের আনাগোনা নিষিদ্ধ? তাহলে যিনি এই ঘোষণা দিয়েছেন তার ভবিষ্যৎ কী হবে? ভবিষ্যতের সেই স্বপ্ন রাষ্ট্রে যদি নারীরাই না থাকে তাহলে সেটা কেমন রাষ্ট্র হবে? ভাবতেই কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। নাহ, আমি হয়তো একটু বেশি ভাবছি।

হয়তো তারা ধরেই নিয়েছেন যে নারীরা যথেষ্ট ক্ষমতাবান হয়ে গেছে। তাদের আর কিছুই লাগবে না। এখন এই গ্রুপটাকে আর বাড়তে দেয়া যাবে না। আবার উল্টোটাও কী হতে পারে? হে নারী, তোমার জন্মই হয়েছে অন্দরে থাকার জন্য, রাষ্ট্রের কাজে তোমার কী? তাই যা বেলাল্লাপনা করার তা হয়েছে, যথেষ্ট পাপ কামাই হয়েছে এখন তুমি আবার জিনি হয়ে বোতলে ঢুকে পড়ো। আমরা সবসময় কথায় কথায় বলি আমাদের দেশটা তো নারীদের হাতেই চলে গেল। কী কারণ? কারণ দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী, স্পিকার নারী। আর কী চাই নারীদের? আবার কেউ কেউ হাস্যরসের ছলেই বলে থাকেন দেশের ক্ষমতা তো আপনাদের নারীদেরকেই দিয়ে দিলাম। এই যে দিয়ে দিলাম এই দুটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত অর্থে নারীরা কতটা ক্ষমতাবান তার উত্তর। অর্থাৎ, নারীদের ক্ষমতা হচ্ছে কারো দেয়া বা না দেয়ার ওপর নির্ভর করছে। আবার অনেকেই বলেন, নারীদের জন্য কত আইন, তাও খালি আপনারা ক্ষমতায়ন চাই বলে কান্নাকাটি করেন। আর কত ক্ষমতা চান? কতটা নির্দয় কিন্তু সরল স্বীকারোক্তি। নারীদেরকে ক্ষমতা দেয়া যাবে কিন্তু তার একটা সীমা থাকা উচিত। তোমাকে ক্ষমতা ততটাই দেয়া হবে যতটা আমরা চাইব। তাই বলে তুমি চেয়েই যাবা সে তো হতে পারে না। এই কথাগুলোকে আমরা হয়তো হেসে উড়িয়ে দেই কিন্তু মর্মার্থ খুব কঠিন। বাস্তবে এখনো নারীদেরকে ক্ষমতার কাঠামোতে দেখতে অভ্যস্ত নই বলেই এতসব উদাহরণ দেই। প্রতিটা বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে ভিতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত বিরোধিতার ছাপ।

আওয়ামী লীগের আগে থেকেই ভিশন ২০২১ ঘোষণা করা ছিল। ঘোষণায় তারা বৈশ্বিক এজেন্ডার সঙ্গে মিল রেখে নারীদের বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়েই কর্মপরিকল্পনা করেছিল। ভিশনের কতটা সফলভাবে অর্জন করেছে বা কতটা তারা পালন করছে সে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হতেই পারে। বস্তুতপক্ষে আগামী নির্বাচনের আগে অবশ্যই হওয়া উচিত। তবে এটুকু অন্তত বলা যায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এজেন্ডার প্রতিফলন দেখেছি সরকারি দলের মাঝেও। তারই অংশ হিসেবে একদম পিছিয়ে পড়া একটা জায়গা থেকে অনেক খালি পথ এগিয়ে এসেছি আমরা নারীরা। মূলত নারীকেন্দ্রিক তাদের ভিশনের দুইটি পার্ট। একটি নারীর ক্ষমতায়ন আর অন্যটি জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা। নারীর ক্ষমতায়নের অংশটি যেমন করেই হোক ব্যক্তি হাসিনার একার চেষ্টাতেই অনেক জায়গাতেই প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অন্ততপক্ষে বলা যায় প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদেরকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। যদিও জেন্ডার সমতার দিকটি রয়ে গেছে প্রায় উপেক্ষিত এবং জেন্ডার সমতার জন্য লড়াই না করলে বা এর জন্য সমাজের যে চেতনার জায়গাটি আছে সেটিকে জাগ্রত না করলে ক্ষমতায়ন স্থায়ী হবে না। তবুও বিষয়টিকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর এটি হয়েছে তাদের মূল এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই। একজন সচেতন বাংলাদেশি নারী হিসেবে আমি চাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মূল কর্মসূচিতে নারীর অধিকার রক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল যার প্রধান একজন নারী তাদের সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনায় নারীদের কোনো অবস্থান নাই। অথচ এই দলটিতে রয়েছে অনেক সচেতন নারী রাজনীতিবিদ যাদের অনেকেই রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় বলেই জানি। তাহলে কী আমরা ধরে নিব বিএনপি নারীদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে না? বিএনপি যদি সরকারে আসে তাহলে কী নারীদের বিষয়গুলো সবই উপেক্ষিত হয়ে যাবে? হতাশ হই যখন দেখি বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের এজেন্ডায় নারীর কোনো স্বীকৃতি পাই না। নাকি তারা ধরেই নিয়েছে নারীদের আবার রাজনীতি কী? তাহলে নারী ভোটারদের কী হবে?

অনেকেই বলেন, আরে এইসব ভিশন টিশন দিয়ে কী হবে? বাংলাদেশের কিছুই হবে না। এদের দিয়ে নারীর উন্নয়ন হবে না। না, আমি তা মনে করি না। একটি রাজনৈতিক দল কেবল একটি দলই নয় তাদের লাখ লাখ কর্মী সমর্থক থাকে। আর যখন কোন একটি ইস্যু দলের মূল কর্মপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয় তখন সেটি অর্জনের একটি তাগাদা থাকে। আর এই তাড়না থেকে তারা কিছু কর্মসূচিও সাজায়। এইসব কর্মসূচির ফলে তাদের কর্মী সমর্থকদের মাঝেও তৈরি হয় সচেতনতা। এর প্রভাব তখন দল ছাড়িয়ে চলে আসে সমাজের অন্যান্য স্তরেও। মানুষের যেমন জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ নির্ধারণ করাটা জরুরি তেমনি প্রতিটা রাজনৈতিক দলের জন্যও সেটা অত্যন্ত জরুরি। আপনার সিলেবাসে যদি নারীদের জন্য কোনো চ্যাপ্টারই না থাকে তাহলে কেমন করে বিশ্বাস করি যে আপনারা নারীবান্ধব সরকার হবেন? আমি তো এমন কোনো সরকার চাই না যে নারীদেরকে গৃহকোণে আবদ্ধ করার শপথে আসবে। এমন সরকার চাই না যে এসেই আমার চলাফেরা, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে। বিএনপিও কী নারীদেরকে তেঁতুলের মতো বলে ফতোয়ায় বিশ্বাস করে? এ বিষয়ে তাদের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পেলে শান্তি পেতাম। নির্বাচনের আগে যদি পরিষ্কার না হতে পারি তাহলে ভোটার হিসেবে সিদ্ধান্ত নেই কেমন করে? ভোটের অধিকার বাতিল না করা পর্যন্ত নারী ভোটারদের বিষয়টা একটু ভেবে দেখবেন বলে আশা করি যাতে করে আমাদেরকে গাইতে না হয়, সাতটি রঙের মাঝে আমি আমায় খুঁজে না পাই, জানিনা তো কেমন করে কী দিয়ে আগাই।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

আমার গ্রিন কার্ড, আমেরিকার ট্রাম্প কার্ড
                                  

আমার আমেরিকার গ্রিন কার্ডটি মনে হচ্ছে বাতিল হতে যাচ্ছে। কারণ কী? আমি কি মুসলিম মৌলবাদী? সন্ত্রাসী? আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত? না। আমি বরং মুসলিম মৌলবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে, মানবাধিকার আর নারীর অধিকারের পক্ষে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করা মানুষ। আমাকে গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়েছিল এক্সট্রা অরডিনারি অ্যাবিলিটি বা অসাধারণ দক্ষতার জন্য। আমার পরিবারের লোকেরা আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়েছে, কারণ তারা আমার পরিবার। আর এখন কিনা, আর যারাই ঢুকতে পারুক আমেরিকায়, আমি পারবো না। সুইডিশ পাসপোর্ট হাতে নিয়েও পারবো না। আমি ট্রাম্পের সমালোচক, তাই বলে? কিন্তু আমার সমালোচনা আর কজন শুনেছে? আমি নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি মানুষ। পৃথিবীর সাধারণ মানুষ কারা ট্রাম্পের নিন্দে করে, হোয়াইট হাউস তার হিসাব রাখে বলে আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় না, সব সমালোচকের আমেরিকায় প্রবেশ করা অথবা বাস করা নিষিদ্ধ। তাহলে কেন আজ আমেরিকায় ঢোকার অনুমতি জুটছে না আমার! আমি তো কোনও অপরাধ করিনি, আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র করিনি। কাউকে মারিনি ধরিনি। কারও পাকা ধানে মই দিইনি। নিরীহ সাদাসিধে ভালো মানুষটিকে কেন জীবনভর ভুগতে হবে একা! আমার মনে হয়, আমেরিকার সীমান্ত রক্ষীরা আমার নামটিকে পছন্দ করছে না, এই নামে, অনেকে বিশ্বাস করে, মুসলিম মুসলিম গন্ধ আছে। আমার আরও মনে হয়, ওরা পছন্দ করছে না যে দেশে আমি জন্মেছি সে দেশের নামটিকেও! পছন্দ করছে না আমার গায়ের রঙ। সে কারণে আমার গ্রিন কার্ডটিকে বাতিল করার ছুতো খুঁজছে, অবান্তর প্রশ্ন করছে, কেন তুমি তোমার গ্রিন কার্ড হারিয়ে যাওয়ার পর দূতাবাসকে সঙ্গে সঙ্গে জানাওনি! দূতাবাসকে জানাতে আমার দুমাস দেরি হলো বলে আমি নিষিদ্ধ হয়ে যাবো! কাম অন।

ট্রাম্প ৭টি মুসলিম দেশের মানুষের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। আসলে তিনি মুসলমান নামের মানুষগুলোকেই বাধা দিতে চাইছেন। যখন আমার আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হচ্ছে, ট্রাম্প তখন মুসলিম মৌলবাদীদের সঙ্গে দুলে দুলে তলোয়ার-নাচ নাচছেন। তিনি মুসলিমদের নিষিদ্ধ করেন, কিন্তু মুসলিম-মৌলবাদীদের নিষিদ্ধ করেন না। মুসলিম মৌলবাদী— যারা টাকা-পয়সা দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে টিকিয়ে রাখছেন, তাঁরা আজ ট্রাম্পের কাছের লোক। তাঁরা হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কেনেন, যে অস্ত্র সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর কাজে নয়, সন্ত্রাসবাদকে আরও বিস্তৃত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ট্রাম্প সুন্নিদের দেশে গিয়ে সন্ত্রাসবাদের জন্য দোষ দিয়ে দিলেন শিয়াদের দেশ ইরানকে। এ ঠিক কেমন বুদ্ধিমানের কাজ করলেন, যখন সারা বিশ্বে সন্ত্রাস করছে যারা, তাদের প্রায় সবাই সুন্নি এবং সৌদি রাজপরিবারের ধর্ম ওহাবিবাদে বিশ্বাসী! অস্ত্র কিনেছে বলে সৌদি আরবের সবাইকে ট্রাম্প ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু সৌদি আরবের সবাই তো অস্ত্র কেনেনি, কিনেছে সৌদি আরবের রাজপরিবার। এই রাজপরিবারের সঙ্গে আমেরিকার প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক খুব মধুর। মধুর সেই ১৯৪৩ সাল থেকেই। সেই কত আগে রুজভেল্ট বলেছিলেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গত সত্তর বছরে সৌদি আরব অবিশ্বাস্য সংখ্যক অস্ত্র কিনছে আমেরিকার কাছ থেকে। ওবামাকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলেও ওবামার আমলে ২০১০ সালে সৌদি আরব কিনেছে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র।

 

ট্রাম্প কী বলেছিলেন সৌদি আরব সম্পর্কে। মনে আছে সে সব? তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় সৌদি আরব সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, এরা উঁচু দালান থেকে সমকামীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরা মেয়েদের মেরে ফেলে, মেয়েদের অকথ্য অত্যাচার করে। আমেরিকার টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পেছনে ট্রাম্প বলেছিলেন, হাত সৌদি আরবের। সন্ত্রাসী হামলার পেছনে যাদের হাত, তাদের কাছে আজ ট্রাম্প অস্ত্র বিক্রি করছেন। তাহলে কি ট্রাম্পকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধের মানুষ বলা যায়? নিশ্চয়ই যায় না। আমেরিকার এই অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেনের গরিবদের মারবে। এর মধ্যে দশ হাজার লোক মরেছে, অগুনতি ইয়েমেনি মানুষ উড়ে গেছে আমেরিকার বানানো বোমায়। গত দুবছরে সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর ৮১ বার হামলা করেছে। হামলা করেছে আমেরিকা থেকে কেনা অস্ত্র দিয়ে। যত বেশি হামলা হবে আমেরিকার অস্ত্র দিয়ে, মগজধোলাই হওয়া তরুণেরা তত বেশি অস্ত্র হাতে নিয়ে পাশ্চাত্যের মানুষদের হামলা করবে। ট্রাম্পের বক্তৃতার কিছু পরেই হামলা হলো ম্যানচেস্টারে। ২২ জনের মৃত্যু হলো।

আইসেনহাওয়ার বলেছিলেন, আমেরিকার মিলিটারি কোম্পানিগুলোর জন্য যা ভালো, তা খুব স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা এবং বিশ্বের জন্য ভালো নয়। একেবারে খাঁটি কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার সরকারে প্রভাবশালী কজন এ কথা বিশ্বাস করে?

ট্রাম্পকে সমর্থন করার লোক প্রচুর ছিল। তারা বিশ্বাস করেছিল, ট্রাম্প ইসলামি সন্ত্রাস দূর করবেন। তাঁরা নিশ্চয়ই আশাহত এখন। সন্ত্রাসের সব দোষ ইরানের ওপর চাপিয়ে বিশ্বময় সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে যারা, তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে, তলোয়ার নাচ নেচে বন্ধুত্ব আরও গভীর করে এলেন ট্রাম্প। সন্ত্রাস বিলুপ্ত করবেন এই ঘোষণা দিয়ে অস্ত্র বিক্রি করে এলেন সন্ত্রাসীদের গুরুর কাছে।

আর এদিকে শুধু আমাকে নয়, মুসলিম দেশে জন্ম অনেককে অযথাই হেনস্তা করছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। আমেরিকা থেকে বের করে দিচ্ছে, অথবা আমেরিকায় ঢুকতে দিতে চাইছে না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষও অনুমতি পাচ্ছে না আমেরিকায় প্রবেশের। আগের সরকার যেভাবে দেশ চালিয়েছে, এই সরকারও সেভাবেই দেশ চালাবে। মাঝে মাঝে ভাবী, আমেরিকার ডেমোক্রেট আর রিপাবলিক দলের মধ্যে আসলে কোনও পার্থক্য নেই। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমেরিকার সরকার, সে যে সরকারই হোক, যা কিছু করতে পারে। মানবতাকে ধ্বংস করতে তাদের মোটেও অসুবিধে হয় না। এই স্বার্থপর দেশটির দিকে আমরা কি না তাকিয়ে আছি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে যে এই দেশটিই শক্ত হাতে সন্ত্রাস মোকাবিলা করবে। আমেরিকা সন্ত্রাস যত নির্মূল করে, তার চেয়ে বেশি সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। সন্ত্রাসী তৈরিতে এক সময় তো সাহায্যও করেছে। আমেরিকার সাহায্য ছাড়া আল-কায়েদা, আইসিস জন্ম নিতো না।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

 

 

নির্বাচন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র
                                  

সরকারি দলের প্রাত্যহিক প্রচারণার প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে নির্বাচনের আর মাত্র মাসখানেক বাকি। অথচ নেতারাই বলছেন, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মিনিট আগেও ক্ষমতা ছাড়বেন না এবং সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন হবে। তাতে বাংলাদেশের মানুষ গুনে দেখছে নির্বাচন হতে আরও অন্তত দেড় বছর দেরি। 

উপপ্রধান সরকারি দল জাতীয় পার্টির প্রস্তুতির পাঁয়তারা আরও প্রবল। ভবিষ্যতে তারা সরকার গঠন করবে, এই প্রত্যয় থেকে একটি ৫৮-দলীয় জোটও গঠন করেছে। ওই জোট বিজয়ী হলে প্রধান দল থেকে জনা ২৫ এবং অন্যান্য দল থেকে ৩-৪ জন করে সদস্যকে যদি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করা হয়, তা হলে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দুই থেকে আড়াই শ ছাড়িয়ে যাবে। এবং সেই অনুপাতে মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা যাঁরা নিযুক্ত হবেন, তাঁদের সংখ্যাও ২৫-এর কম হওয়া অসম্ভব।

সরকারে বাম ঘরানার দুই-আড়াইটি দল আছে। তারা সরকারি জোটের সি-টিম  নির্বাচিত প্রধান দল যা দেবে তাতেই তারা সন্তুষ্ট। নির্বাচনে খাড়া করে যদি পাস করিয়ে আনে তাতেই আনন্দ, আর যদি নির্বাচন-টির্বাচনের ঝামেলায় না জড়িয়ে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রাপ্তিযোগ ঘটে তাতেও পরমানন্দ। মন্ত্রী হওয়া নিয়ে কথা, কী প্রক্রিয়ায় হওয়া গেল, তা বিবেচ্য নয়।

আগামী নির্বাচনের প্রসঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সংসদের সদস্যদের উদ্দেশে বলেছেন, ২০১৪-তে কীভাবে তাঁরা সংসদ সদস্য হয়েছেন তা তাঁরা ভালোই জানেন, আগামী নির্বাচন সে রকম হবে না। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। জনগণের ভোটে পাস করে আসতে হবে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও বিনা ভোটে নয়। তাঁর কথা শোনার পর অনেকের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার জো! অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ঠিকমতো মন দিতে পারছেন না। চার-পাঁচটা মুঠোফোন অনবরত বাজতে থাকলেও ধরছেন না। মন খারাপ।

বিএনপি তাদের ভিশন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। বাংলাদেশের জনগণ ভীষণ উদ্বিগ্ন দেশে গণতন্ত্র থাকবে কি থাকবে না—এই চিন্তায়, ভিশন-টিশন নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। অনেকেই জানেন, ২০৩০ কিংবা ২০৪১ সাল পর্যন্ত তাঁরা ইহলোকে থাকবেন না। সুতরাং সেই সময় বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ হলেই কি, জাতিসংঘের ভেটো প্রদানকারী স্থায়ী সদস্য হলেই কি এবং এক নম্বর পরাশক্তি হলেই কি? মানুষ দেখতে চায় আগামীকাল, আগামী মাসে বা আগামী বছরে বাংলাদেশের কি অবস্থা দাঁড়াবে।

উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত না করেই একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হোক, নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করুক, সেটাই সাধারণ মানুষের দাবি। সব লক্ষ্য অর্জনের এক একটি পর্যায় থাকে। প্রথম পর্যায় বাদ দিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় পর্যায় বা শেষ পর্যায় নিয়ে মাথা ঘামানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জাতি চায় এখন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ নির্বাচন জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেশের শাসনভার যে শুধু পেয়ে থাকেন তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নির্বাচন জাতির ভাগ্যে বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে।

১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন হয়, তাতে বাঙালি জাতির জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতায়, শাসকদের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতায় সেই পরিবর্তনকে ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত করা সম্ভব হয়নি। সেই অগণতান্ত্রিক অবস্থা থেকে অব্যাহতি পেতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখে ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন। চুয়ান্নর নির্বাচন শুধু পাঁচ বছর প্রদেশ শাসনের জন্য জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেনি, জাতির ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা দিয়ে যায়। ওই নির্বাচনের শিক্ষা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পৌঁছে দেয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। পূর্ব বাংলা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান, যে শব্দটি বাঙালি আড়াই হাজার বছরে কোনো দিন শোনেনি, সেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তন ঘটে ‘বাংলাদেশ’-এর, যা তার আসল নাম। চুয়ান্নর নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই ভূমিকা রেখেছে আরও একটি নির্বাচন: ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। সত্তরের নির্বাচন এবং তারপর একাত্তরে গণহত্যা না হলে তার বিকল্প কি ছিল, তা শিশু ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছাড়া যে কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব। সেই বিকল্প ভালো হতো কি মন্দ হতো, তা কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন ১৯৭৩-এর নির্বাচনটি হতে পারত এবং হওয়া উচিত ছিল জাতির জীবনে আরেকটি মাইলফলক। তা না হওয়ার পরিণতি এ দেশের জনগণ শুধু এখন নয়, ২০৭৩-এ গিয়েও উপলব্ধি করবে। ওই  নির্বাচনে দেশ থেকে  বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার নীতি গ্রহণ করে শুধু যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন হয়েছে তাই নয়, অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পথ প্রসারিত করা হয়। যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, সেই অঙ্গীকারকে অস্বীকার করা হয়। জনপ্রিয় নেতা দেশ পরিচালনা করছিলেন, তাঁর প্রতি মানুষের আস্থা ছিল, তাদের আশা ছিল, সেই অবস্থায় সংসদে ৩৫-৪০টি আসন বিরোধী দল থেকে থাকলে সরকারের এক ছটাক ক্ষতি হতো না। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমার হাত ধরে বললেন, ‘তিহাত্তরেই সর্বনাশ হইয়া গ্যাছে, তার খেসারত আরও দিতে হইব।’ তা যে দিতেই হবে, তা আমি ঘরে ফিরে ভেবে দেখলাম। কারণ, কথাটি তিনি একজন প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে পারেননি। বললেন, প্রাইভেটলি আমাকে বা আমার মতো আরও কারও কারও কাছে।

চুয়ান্নর নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন নিজে এবং তাঁর দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা তাঁর তারিফ করেছেন। সে প্রশংসা তিনি পেয়েছিলেন এই জন্য যে সরকারপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রশাসনকে প্রভাবিত করার কিছুমাত্র চেষ্টা করেননি। সেটা করলে পরাজিত হলেও তাঁর দল মুসলিম লীগ আরও বেশ কিছু আসন পেত। সেকালের সিভিল সার্ভেন্টরাও সরকারের আনুগত্য স্বীকার করতেন, কিন্তু সরকারি দলের দাসত্ব বরদাশত করতেন না। সরকারি দলের ছাত্র-যুব সংগঠনের বশ্যতাও মেনে নিতেন না। তাঁরা ছিলেন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের দাস নয়।

এখন অনেকের কাছে তাজ্জবেরমতো মনে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে জনা পাঁচেক কুখ্যাত বর্বরের একজন হলেও জেনারেল ইয়াহিয়া খানকেও সত্তরের নির্বাচনের পর অনেকে প্রশংসা করেছেন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। সেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ফলাফল যখন তিনি ও তাঁর সহযোগীরা অগ্রাহ্য করেন তখন এ দেশের মানুষের নিজের ভাগ্য নিজেদের গড়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকল না। অনিবার্য হয়ে যায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটে যে বাংলাদেশের তার ১৯৭২-এ গৃহীত সংবিধানই যেকোনো দলের যেকোনো নির্বাচনের সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী মেনিফেস্টো হতে পারে। তার সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনে যোগ হতে পারে নতুন নতুন অঙ্গীকার। জাতীয় সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট হবে না তিন কক্ষবিশিষ্ট হবে, তা এই মুহূর্তের জরুরি বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করা হবে না আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে, সেটাও পরে দেখা যাবে। দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট থাকার কথার মধ্যে রাজনৈতিক দর্শনের কিছু নেই। বিএনপি বলছে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা। তাদের জোটের জামায়াতে ইসলামী যদি বলে দুই কক্ষে হবে না তিন কক্ষবিশিষ্ট সংসদ চাই, তাতে যে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, তা বিশ্বাস করা আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকের পক্ষে কঠিন।

রাজতন্ত্রে বংশানুক্রমে রাজার ছেলে রাজা হয়। গণতন্ত্রে যিনি জনগণের আস্থাভাজন তিনিই নেতা হন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে। পুরোনো ও প্রবীণ নেতৃত্ব কি তা হলে বাতিল হয়ে যাবে? না, তা নয়। তাঁরা নতুন নতুন নেতৃত্বের অভিভাবক হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে থাকেন। নতুনদের তাঁরা বুদ্ধি-পরামর্শ দেন। নতুনরা ভুল করলে মুরব্বির মতো তাঁদের শাসন করেন। গণতন্ত্রে নতুন-পুরানোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের কারণ নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ বন্ধ বহুদিন। দুই দল তাদের ভিশন ও রূপকল্প বাদ দিয়ে যদি পাঁচজন করে তাদের ভবিষ্যৎ নেতার নাম ঘোষণা করত, তাহলে জনগণের মধ্যে আশার সৃষ্টি হতো। ওই দশজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো জাতিকে তাঁরা কত ভালো নেতৃত্ব দিতে পারেন। তাঁদের কারও থেকে যদি কোনো ভিশন আসত, জনগণ সেটা বিবেচনা করত।

নির্বাচনের আওয়াজ যখন উঠেছে তখন নির্বাচন একটা হবেই। গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং বঙ্গীয় নির্বাচন এক জিনিস নয়। একশ্রেণির রাজনীতি করনেওয়ালাদের কাছে নির্বাচন একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প। আরও সোজা করে বলতে গেলে বাণিজ্য। একজন শিল্পোদ্যোক্তা যখন একটি শিল্পকারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন, তিনি তা করেন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য। বর্তমান অবস্থায় একজন জনদরদি নির্বাচিত হতে চান বৈষয়িকভাবে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যে। তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার তিলমাত্র সম্পর্ক নেই।

যে নির্বাচনী ব্যবস্থা আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে, তা গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই নির্বাচনী ব্যবস্থা একটা স্রেফ অর্থনৈতিক ব্যাপার, এর মধ্যে রাজনীতির লেশমাত্র নেই। এই নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে পরিমাণ টাকা খাটিয়ে ২৫ বছরে যে মুনাফা হবে, কোনোক্রমে নির্বাচিত হলে একজন সাংসদ ৩-৪ বছরেই তার বহু গুণ অর্জন করতে পারেন।

তারপরও বলব, বাস্তবতার বাইরে আমরা যেতে পারব না। নিয়তি বাংলার মানুষকে এই অবস্থার মধ্যেই থাকতে বাধ্য করেছে। তাই বলব, যিনি যে দলেরই হোন, অঢেল টাকা ঢেলে বা যে প্রক্রিয়ায়ই নির্বাচিত হোন, শপথ নেওয়ার পর তাঁর প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সংবিধান রক্ষা করা। সংবিধান রক্ষার সংজ্ঞা হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল থাকা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। ইট-পাথর, লোহালক্কড় ও সিমেন্টের মাধ্যমে যে উন্নয়ন তা অন্য জিনিস, গণতন্ত্র নয়। আগামী নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নির্বাচন হোক—এই প্রত্যাশা।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

সৃজনশীলতা ও শিক্ষানীতির ভবিষ্যৎ
                                  

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কিছু সরকারি লোক ছাড়া শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার মনেই দারুণ যন্ত্রণা আছে। চলমান ব্যবস্থায় সবাই বোঝে, কিংবা বুঝতে বাধ্য হয় যে শিক্ষা মানে পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পাওয়ার প্রস্তুতি। ধারণা চালু হয়ে গেছে যে পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি—এই চারটি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেলে ছেলে-মেয়েরা সৃজনশীল বা Creative হয়। দেশে গত কয়েক বছরে হয়তো পাঁচ-ছয় লাখ সৃজনশীল বা Creative ব্যক্তি তৈরি হয়েছে। এই ব্যবস্থা চালু থাকলে ক্রমে সৃজনশীল বা Creative লোকের সংখ্যা কোটি কোটিতে পৌঁছে যাবে। এত বিরাট আয়োজনের মধ্যে, এত ঢাকঢোলের আওয়াজের মধ্যেও কিছু সরকারি লোক ছাড়া শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বাকি সবার মনে দারুণ যন্ত্রণা। শিক্ষার নামে কী চলছে?Cambridge Handbook of Creativity-গ্রন্থে পত্বধঃরাব বা সৃজনশীল ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, The Creative person is both more primitive and more cultured, more destructive and more constructive, occasionally crazier and yet adamently saner than the average person. সৃজনশীল বা পত্বধঃরাব ব্যক্তিদের আরো অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা বইটিতে পাওয়া যায়। বইটিতে আবিষ্কারক, উদ্ভাবক, মহামানব, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজসংগঠক, ধর্মপ্রবর্তক ও আদর্শ প্রতিষ্ঠাতাদের বলা হয়েছে creative বা সৃজনশীল। Oxford Handbook of Creativity-তেও creative person বা সৃজনশীল ব্যক্তি সম্পর্কে এ ধরনের কথাই পাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত creativity বিষয়ক আরো তিন-চারটি বইতে Creativity সংক্রান্ত এ রকম বক্তব্যই পেয়েছি। ইউরোপ-আমেরিকার কিছু জাতি creativity-র প্রতি খুব আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল। ক্রিয়েটিভরা অন্তরের তাগিদে কাজ করেন কোনো লাভ-লোভের জন্য নয়। বাংলাদেশের সরকার যখন থেকে creativity নিয়ে আগ্রহী হয়েছে, তার চেয়ে অন্তত ১৫ বছর আগে থেকে আমি creativity নিয়ে অনুসন্ধিত্সু হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমার যে পতনশীল জাতির উত্থানের জন্য জাতির ভেতরে creativity অপরিহার্য। আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে, আদর্শ চর্চায় ও রাজনীতিতে সৃজনশীলতা নেই। এটাও আমার ধারণা হয়েছিল যে বাংলা ভাষার দেশে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের কালে জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্ল চন্দ্র, প্রশান্তচন্দ্র, মেঘানন্দ সাহা, সত্যেন বোসের কালে, রোকেয়া, লুত্ফর রহমান, নজরুল, ওদুদের কালে, সুরেন্দ্রনাথ, বিপিন পাল, চিত্তরঞ্জন, সুভাষ বসুর কালে, শেরেবাংলা, ভাসানী, শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনের কালে creativity বা সৃজনশীলতা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে অবস্থা বদলে গেছে। এখন প্রতিবছর অর্ধ লাখের বেশি সৃজনশীল তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা প্রবর্তন করেছেন, বাংলাদেশকে creative করে তোলার বড় কোনো অনুপ্রেরণা নিয়ে কি তাঁরা কাজে নেমেছেন? টেলিভিশনের পর্দায় ও দৈনিক পত্রিকার উপসম্পাদকীয় লেখায় কয়েকজন সম্মানিত সরকারদলীয় শিক্ষাবিশেষজ্ঞ প্রায়ই প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষে ওকালতি করে বক্তব্য প্রকাশ করেন। তাঁদের কথা শুনে শিক্ষার্থীদের মনে, অভিভাবকদের মনে, শিক্ষকদের মনে কোনো আশাবাদ কি জাগে? প্রচারমাধ্যম আগে কখনো এত শক্তিশালী ছিল না। প্রচারমাধ্যম এখন প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষে প্রচার দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখে। দেশে চিন্তাশীলতা ও চিন্তা চর্চা দুর্লভ। যেসব দল ও গোষ্ঠী সরকারের বাইরে সক্রিয়, সরকারের সমালোচনা করে, সরকারি নীতি ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করে, লোকে তাদের অপদার্থ বলে থাকে। তাদের দিয়ে ভালো কিছু হবে—এমন আশা কেউ করেন বলে মনে হয় না। তারা নিজেরাও কি নিজেদের ওপর আস্থাশীল?

সরকার প্রচলিত ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে কিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। প্রচারমাধ্যমে দেখা গেল যে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। এটা ভালো কাজ। শুধু স্থগিত নয়, বাতিল করতে হবে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করা দরকার। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে কল্যাণকর নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা দরকার। ইংলিশ ভার্সন বাতিল করতে হবে। এমনি আরো কিছু বিষয় আছে সেগুলোও পরিবর্তন করা দরকার। আমি দেড় বছর ধরে অবিলম্বে সেগুলোর পরিবর্তন সাধনের কথা নানাভাবে লিখে ও বলে সবার কাছে আবেদন জানিয়ে আসছি। সরকার কি সেগুলো বিবেচনা করবে এবং জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে? আমার তো মনে হয়, এসব করলে সরকারের ভোট বাড়বে। অবশ্য ভোটাভুটি যেভাবে চলে আসছে, তার অনেক কিছুই আমি বুঝি না। একটা ব্যাপার বুঝতে পারি যে লোকে এখন গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ভোটাভুটিতেও লোকের উৎসাহ নষ্ট হয়ে গেছে। আগের মতো হুজুগ তৈরি করা এখন কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন জমে উঠছে না। তবে টাকার প্রতি লোভ বেড়েছে। টাকাওয়ালারা প্রায় সব পারে। পেশিশক্তিকে লোকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মান্য করে। সমাজে ক্ষতি করার শক্তি যার যত বেশি, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি তত বেশি। মানুষের কল্যাণ করার শক্তি এ সমাজে কোনো শক্তি বলেই স্বীকৃতি পায় না। রাজনীতিতে অকার্যকর ভাষার ব্যবহার বেড়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাংলাদেশে ক্ষমতার উত্থান-পতন নিয়ে ভীষণভাবে ব্যস্ত।

সরকার, সরকারি দল নিজের স্বার্থে চিন্তা ও কাজ করে। সর্বজনীন কল্যাণের চিন্তা দুর্লভ। সরকার, সরকারি দল যাতে করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে পারে তা মনে রেখেই তো শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করে থাকে। এর অন্যথা আশা করা বোকামি। সরকার ও সরকারি দল শুধু একবার ভোটে জিতেই সন্তুষ্ট নয়, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী, পারলে চিরস্থায়ী করতে চায়।

বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ায়, জারতন্ত্রের কালে লিও তলস্তয় (১৮২৮-১৯১০) লিখেছিলেন, The strength of the government lies in the ignorance of the people, and the government knows this and will therefore always oppose true enlightenment. It is time to realise this, and it is most undesirable to let the government advance while it is spreading darkness and pretend to be busy with the enlightenment of the people. It is daring this now by means of all sorts of pseudo-educational establishment which it controls : schools, high schools, universities, academies and all kinds of committees and congresses. But good is good and enlightenment is enlightenment only when it is quite good and quite enlightened. I am extremely sorry when I see valuable, disinterested and self-sacrificing efforts spent fruitlessly. It is strange to see good wise people spending their strength in a struggle against the government, but carrying on the struggle on the basis of whatever laws the government itself likes to make. It seems to me that it is now especially important to do what is right quietly and persistently, not only without asking permission from government, but consciously avoiding its participator. 

তলস্তয়ের দেশকাল থেকে আমাদের দেশকাল ভিন্ন। প্রতিটি সরকার শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে রূপ দেয় তার রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী। কোনো সরকার কি এমন শিক্ষাব্যবস্থা চলতে দিতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীদের চোখ খুলে যাবে এবং প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করবে? একালে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে সরকারের পেছনে আছে বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো, ইউনিসেফ, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তাদের স্বার্থ অনুযায়ীই শিক্ষাব্যবস্থা গঠিত ও পুনর্গঠিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে ব্যতিক্রম ঘটবে যদি জনগণের গণতন্ত্র, জনগণের সরকার ও জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণ জাগ্রত হলে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হলে অন্য রকম হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ও গোটা পৃথিবীতে জনগণ এখন ঘুমন্ত—জাগ্রত নয়। সহজে জনগণের ঘুম ভাঙবে? জনগণ যদি ঘুমিয়েই থাকে তাহলে যে ধারায় চলছে সে ধারাতেই চলতে থাকবে। এ দেশে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণ উপায়ে হয় না; হঠাৎ জনগণ বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে, রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান দেখা দেয়। সে রকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও এখন দেখা যায় না। জনগণ গভীর নিদ্রায় মগ্ন। গতানুগতিক ধারায় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষাবিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কিছু ব্যয়বহুল প্রকল্প সব সময় চালু থাকে, এখনো আছে। এর মধ্যে বেশ বড় কিছু নতুন প্রকল্পের খবর প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। খবরে প্রকাশ, মাধ্যমিকে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচি আসছে। খবরে বলা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ১৪টি প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে চলছে ৯টি। এগুলোর কোনোটি মোটামুটি চলছে, কোনোটি ভালো চলছে, কোনোটি নিয়ে আছে বিতর্ক। এর মধ্যেই মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বড় একটি কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে সরকার। পাঁচ বছরমেয়াদি এই কর্মসূচিতে সরকারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইউনিসেফ, ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ কয়েকটি বিদেশি সংস্থা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে। খবরে আরো বলা হয়, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি) নামে একটি বড় কর্মসূচি চলছে। এর মোট ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই কর্মসূচির আদলেই এখন মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এই কর্মসূচি শুরুর সম্ভাবনা আছে। খবরে বলা হয়, বিশ্বব্যাংক বর্তমানে মাধ্যমিকের একটি প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। সেটি আগামী জুনে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত থাকতে চাইছে। এ জন্য শিগগিরই এ কর্মসূচি করতে চাইছে। আর এডিবির সঙ্গে যে কর্মসূচি চলছে সেটি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। খবরে বলা হয়, প্রস্তাবিত এই কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক ৫০০ মিলিয়ন ডলার ও এডিবি ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিতে পারে। কর্মসূচির অধিকাংশ টাকাই দেবে সরকার। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এই কর্মসূচির মাধ্যমে বেতন-ভাতাও দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে চলমান প্রকল্পগুলো এর অধীনে চলে আসবে। খবরে প্রকাশ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর কর্মসূচি সাজানো হচ্ছে। এ জন্য স্বচ্ছভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করা, মাধ্যমিকে ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করা, জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার জন্যও সহায়তা দেওয়া, নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষাক্রমকে উন্নত করা, নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে বিশেষভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন ধরনের উপকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে এই কর্মসূচির লক্ষ্য। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন, শিক্ষার্থীদের বাংলা-ইংরেজি, গণিত-বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নসহ আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

খবর থেকে বোঝা যাচ্ছে, গতানুগতিক ধারায় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে। এর জন্য অর্থসংস্থানও অসামান্য। খবরে প্রকাশিত এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বাইরেও প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আরো প্রকল্প গ্রহণ করা হবে এবং আরো অনেক টাকা জোগাড় হবে। এসব নিয়ে এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষানীতির উন্নয়নের জন্য জাতীয় সংসদে গভীর ও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা দরকার। কিন্তু তা হয় না। শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে জাতির প্রাণশক্তির অবস্থান। এ জন্য এ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি দরকার। দরকার চিন্তায় ও কাজে আন্তরিকতা ও সততা। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষানীতি নিয়ে এবং জাতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চাই বহুজনের বহু আলোচনা।

সংকটাপন্ন ক্ষয়িষ্ণু পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির অন্ধ অনুসরণে গিয়ে আমরা আমাদের সত্তা হারিয়ে চলেছি। ইউরোপ-আমেরিকায় প্রগতিশীল দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আছে, আদর্শ আছে। সেসব আমাদের গ্রহণ করতে হবে আমাদের সন্তানকে সমৃদ্ধ করার জন্য। আর তাদের উপনিবেশবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা ও কর্মনীতি আমাদের পরিহার করে চলতে হবে।

লেখক : চিন্তাবিদ, অধ্যাপক

কামিনীকাতর যামিনীর ভয়ঙ্কর উপাখ্যান!
                                  

নারী-পুরুষের অবৈধ প্রণয় এবং নিষিদ্ধ মেলামেশার ভয়ঙ্কর সব উপাখ্যান রাতের বাতাসকে নিয়ত বিষাক্ত করে তুলেছে। বাহারি কুকর্মের পাত্র-পাত্রীরা ইদানীংকালে বাংলাদেশের শহরে-বন্দরে এবং গ্রামগঞ্জে এমন সব অপরাধের জন্ম দিচ্ছে যা গত দুই-চার-দশ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না। বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে, জামাই-শাশুড়ি, শ্বশুর-পুত্রবধূ, ছাত্রী-শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকা-ছাত্রের মতো পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক সম্পর্কের মাঝে যেসব অশ্লীলতার কথা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তা বিবেকসম্পন্ন লোকজনকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।

ঢাকার রেইনট্রি নামক একটি আবাসিক হোটেলকে ঘিরে জমজমাট মাদক ও যৌনতার আসর দেশবাসীকে যতটা না উদগ্রীব এবং উত্কণ্ঠিত করে তুলেছে, তার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছে পিতা-পুত্রের চিরায়ত সম্পর্কের হাল আমলের অশ্লীলতা এবং নোংরা উপাখ্যান জানার পর। অভিযুক্ত পুত্র তার দুই বন্ধুসহ সারা রাত দুই তরুণীকে ধর্ষণ করলেন। ধর্ষণের আগে নিজেরা মাতাল হলেন এবং তরুণীদের মদ্যপানে বেসামাল করলেন। নিজেরা ইয়াবা নামক মরণনেশার বড়ি খেলেন এবং অন্যদেরও খাওয়ালেন। ধর্ষণের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করালেন এবং ফিল্মি কায়দায় অস্ত্র উঁচিয়ে নির্যাতিতদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিলেন। উপর্যুপরি ধর্ষণে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে তরুণীদ্বয় যখন মেঝেতে গড়াগড়ি করে আর্তনাদ করছিলেন তখন ধর্ষকরা উল্লাসের অট্টহাসি দিয়ে বলেছিলেন—চুপ। একদম চুপ। শুধু আজকে নয়— এখন থেকে নিয়মিত আমাদের কথায় এখানে আসতে হবে এবং এমনটি করতে হবে!

উপরোক্ত ঘটনা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর প্রধান ধর্ষকের কথিত বাবা দম্ভোক্তি করে বলেন—জোয়ান পোলা। একটু-আধটু তো করবেই। আমিও তো করি! ধর্ষণের ঘটনায় দেশের আমজনতা যতটা না আতঙ্কিত এবং বেদনাহত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি বেদনাহত হয়েছেন ধর্ষকের পিতার মুখ নিঃসৃত আবর্জনা শুনে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এত বড় জঘন্য কর্ম যদি একটু-আধটু হয় তাহলে পুরোটা করলে না জানি কতটা নির্মম ও নৃশংস হতো।

রেইনট্রি হোটেলের ঘটনার আগে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে স্ত্রীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন তার স্বামী। স্বামীর লাশ খাটের তলায় রেখে স্বামী ঘাতিনী স্ত্রী তার পরকীয়ার নাগরের সঙ্গে সেই খাটের ওপরই শুরু করেন ব্যভিচার। পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর নির্বিকার চিত্তে অবলীলায় বলতে থাকেন নিজের কুকর্মের ফিরিস্তির ভয়ঙ্কর সব উপাখ্যান। গত ১৮ মের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আরও একটি পিলে চমকানো খবর প্রকাশিত হয়েছে। জনৈক নারী তার পরকীয়া দেখে ফেলার অপরাধে নিজের ১৩ বছরের কন্যা এবং স্বামীকে নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে।

সাম্প্রতিককালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, কামিনীকাতর নারী-পুরুষের অবৈধ অভিসারের অভিশাপে রাতের আঁধার নিরীহ দেশবাসীর জন্য এক সীমাহীন আতঙ্ক বয়ে নিয়ে আসে। পাপাচারের ধরন ও প্রকৃতির কারণে সাধারণ মানুষের চিরায়ত বিশ্বাস ও ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার নিজেদের আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের কথাও কাউকে খুলে বলতে পারছে না। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-পরিজনের সাবলীল সম্পর্কের মধ্যে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে একে অপরকে এমন সব কথাবার্তা বলছে বা শোনাচ্ছে যা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য আদৌ মঙ্গলজনক নয়।

অবৈধ অর্থ-বিত্ত, বড় বড় পদ-পদবি এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে অশান্ত, উত্তপ্ত এবং বন্ধনহীন করে তুলছে। এগুলোর প্রভাবে নীতি-নৈতিকতা, লজ্জা-শরম, পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বিলীন হতে বসেছে। পাপী মনের অস্থিরতা এবং অবৈধ অর্থের গরমকে সামাল দেওয়ার জন্য মানুষ সব সময় চটুল, হালকা এবং নিষিদ্ধ বিনোদনের রাস্তা খুঁজে বেড়ায়। এ কারণে অনাদিকাল থেকে এই শ্রেণির মানুষ কামাতুর হয়ে যামিনী বিহারে বের হয়ে নিজেদের ভিতরকার পাশবিকতা উদগীরণের জন্য ফন্দি-ফিকির করে আসছে। রাষ্ট্রের সুশাসন, ন্যায়বিচার, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা ছাড়া এসব অপকর্ম কোনোকালে বন্ধ হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ হলো—এখানকার পাপাচারের ধরন, প্রকৃতি, মাত্রা ইত্যাদি ইতিহাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিত্যনতুন উপাখ্যান সৃষ্টি করছে।

লেখক :  সাবেক সংসদ সদস্য

 

 


   Page 1 of 6
     মত-দ্বিমত
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
আয়করে নজর দেওয়া উচিত ছিল, ভ্যাটে নয়
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
প্রবৃদ্ধির আত্মতুষ্টি অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
দুধ কলায় বিষধর সাপ পুষেছে সরকার, রাস্তায় গাল দেয় ইমরান সরকার!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
ভেঙে গেল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিকের স্বপ্ন!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
কাফেলার অদৃশ্য সালার -তালিম হোসেন
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
জামায়াতকে নিয়ে কী করবে বিএনপি?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জিয়াউর রহমান
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
ভিশন-২০৩০ কতটা অনুসরণ করবে বিএনপি?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
মহাজোট নাকি মহাফ্যাসাদ! সানাউল হক নীরু
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
নষ্ট সমাজে উৎকট দুর্গন্ধের মহামারী!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বিএনপির নারীবিহীন রংধনু রাষ্ট্র
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
আমার গ্রিন কার্ড, আমেরিকার ট্রাম্প কার্ড
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
নির্বাচন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
সৃজনশীলতা ও শিক্ষানীতির ভবিষ্যৎ
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
কামিনীকাতর যামিনীর ভয়ঙ্কর উপাখ্যান!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বাংলাদেশকে দেবার মত ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কিছুই নেই
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
“ছেলেদের দোষ নাই, আমাদের পোশাকের কারণে আমরা ধর্ষণের শিকার হই”
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
খালেদার রূপকথা (রূপকল্প) : ওদের কেন মাথা ব্যথা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বিএনপি কি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিল?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
ঊনাশিতেই আন্তর্জাতিকভাবে দাবি ‍তুলেছিলেন শেখ হাসিনা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
অগণতান্ত্রিক গণতন্ত্রে দুর্ভাগা বাংলাদেশ। সায়েক এম রহমান।
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
দৈহিক সম্পর্ক আমার নেশা : তসলিমা নাসরিন
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
হেফাজত-ইসলামী ঐক্যজোট, সবই কি আ. লীগের দখলে যাচ্ছে?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
ক্রসবাঁধের কারণে হাওরে এমন বন্যা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
পরিবহন মালিকরা কি সরকারের উর্ধ্বে?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
সভাপতি পাগল, সাধারণ সম্পাদক খুনি!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
জাতিসত্তা, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র ও প্রোপট
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
তিস্তা চুক্তি: আলোচনার গলদ >>আসিফ নজরুল
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বরখাস্ত হচ্ছেন গণপ্রতিনিধিরা!
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বন্ধুত্ব চাই তবে সামরিক চুক্তির দ্বারা নয়
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
জাতীয়তাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বাংলা নববর্ষ শুধু উৎসব নয় || সেলিনা হোসেন
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
৪৬ বছর পর, আজও স্বাধীনতা খুঁজছি: সৈয়দ আহমদ সানি
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
’’জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াই প্রথম রাষ্ট্রপতি’’
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তরুনপ্রজন্মের ভাবনা
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
`ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার কখনো গনতান্ত্রিক হয় না`
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
প্রসঙ্গ ধর্ম এবং আওয়ামী লীগ
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
সাবেক বিচারপতি কি বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে অভিযুক্ত করতে পারেন?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
জঙ্গিবাদের প্রতিষেধক: বিশুদ্ধ আদর্শ
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
অন্তর্বর্তী সরকার বলে কিছু আছে?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
দাম ‍বৃদ্ধি জনগণকে ভোগাবে : ড. সালেহ উদ্দিন
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
রকিব ইসির বেহেস্ত নসিব করুন
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
পদ্মায় বিশ্বব্যাংকের সলিল সমাধি: শেখ হাসিনাই প্রকৃত কমরেড
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
শেষ বয়সে সুরঞ্জিতকে কোণঠাসা করার চেষ্টাও ছিল: আসিফ নজরুল
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
এ কোন নৈরাজ্যিক বাংলাদেশি সমাজ?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
বাংলার আরেকটি আন্তর্জাতিক বিজয়
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
কে হবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
রক্তাক্ত পরিচয়পত্র
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......
অস্থির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: কারা, কেন, কিভাবে?
............ ...... ....... ....... ............................. .......................... ... .... ......